উদ্ধার হওয়া নারীর সংকট: মুক্তির পরও বন্দিজীবনের বাস্তবতা

সংবিধানের পাতায় সব নাগরিকের সমান অধিকারের অঙ্গীকার থাকলেও বাস্তব জীবনের কঠিন মাটিতে দাঁড়িয়ে একজন নিপীড়িত নারীর আর্তনাদ যেন অনেক সময়ই অনুচ্চারিত থেকে যায়। পারিবারিক সহিংসতা, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি কিংবা মানব পাচারের শিকার হয়ে কোনো নারী যখন অন্ধকার ভেদ করে আলোর পথে ফিরতে চান, তখন প্রশ্ন জাগে—রাষ্ট্র ও সমাজ তাকে ঠিক কতটা সহায়তা দিতে পারে? ‘উদ্ধার’ হওয়া কি সত্যিই মুক্তি, নাকি সেটিই হয়ে ওঠে আরেক নতুন সংগ্রামের শুরু?
অন্ধকার থেকে ফেরা—তারপর কী?
কোনো গোপন আস্তানা বা পতিতালয় থেকে পাচার হয়ে যাওয়া এক কিশোরী অসহায় পরিস্থিতিতে কোনোভাবে একটি ফোন পেয়ে সাহায্যের জন্য আবেদন জানায়। প্রশাসনের উদ্যোগে তাকে উদ্ধার করার পর সমাজ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, মনে হয় মেয়েটি বেঁচে ফিরেছে। কিন্তু বাস্তব প্রশ্নটা সেখানেই শুরু—এরপর তার গন্তব্য কোথায়?
উদ্ধার হওয়া মাত্রই একজন নারীর প্রয়োজন তাৎক্ষণিক চিকিৎসাসেবা, ট্রমা বা মানসিক আঘাত কাটিয়ে ওঠার জন্য সাইকো-সোশ্যাল কাউন্সেলিং এবং আইনি সুরক্ষা। কিন্তু আমাদের থানাগুলো কি এখনও প্রকৃত অর্থেই ‘ভিকটিমবান্ধব’ বা ‘নারীবান্ধব’ হয়ে উঠতে পেরেছে? বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উত্তর–না। ফলে প্রথম ধাপেই ভুক্তভোগীকে পড়তে হয় নতুন এক অনিশ্চয়তায়।
আইনের জট, বাস্তবের সংকট
আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বলছে, দেশে আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশে আইন আছে কিন্তু প্রয়োগ নেই; আশ্রয়কেন্দ্র আছে কিন্তু সেখানে নেই মানবিক পরিবেশ; বিচারিক কাঠামো আছে কিন্তু সেখানে পৌঁছাতে গিয়ে পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হয় ভুক্তভোগীকে।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে একজন নারী দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার অভিযোগ করার সাহসই হারিয়ে ফেলেন। তারা বুঝতে পারেন, বিচার চাওয়ার কণ্টকাকীর্ণ পথটি অনেক সময় মূল অপরাধের চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক। ফলে অপরাধীরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে, আর ভুক্তভোগী থেকে যায় নীরবতার গণ্ডিতে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বিভিন্ন জরিপও সাক্ষ্য দেয়, দেশে নির্যাতনের শিকার হওয়া নারীর সিংহভাগই আইনি কাঠামোর বাইরে থেকে যান সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং দীর্ঘমেয়াদি আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থাহীনতার কারণে।
আশ্রয়কেন্দ্র—নিরাপদ নাকি আরেক কারাগার?
উদ্ধারের পর নারীদের সাধারণত ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার বা শেল্টার হোমে রাখা হয়। কিন্তু এসব জায়গার পরিবেশ নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ। উন্নত বিশ্বে যেখানে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো একটি স্বাভাবিক বাড়ির মতো, সেখানে বাংলাদেশের অনেক সেফহোম যেন বন্দিশালার মতো।
সরকারি সেফহোমগুলোয় গেলে ফিনাইল বা ডেটলের কড়া গন্ধ পাওয়া যায়। পরিবেশটা অনেকটা জেলখানার মতো। সেখানে নেই কোনো মুক্ত বাতাস, ন্যূনতম কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা নেই, খেলাধুলার জায়গা বা লাইব্রেরি নেই। পদে পদে থাকে বিধিনিষেধ।
এমন পরিবেশে একজন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত নারী কীভাবে সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার স্বপ্ন দেখবেন? যদিও কিছু এনজিও পরিচালিত শেল্টার হোমে পারিবারিক পরিবেশ ও মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা থাকে, তবে সরকারি তহবিলের অপ্রতুলতা এবং অনুদাননির্ভরতার কারণে দেশজুড়ে এর মানোন্নয়ন সম্ভব হচ্ছে না।
বন্ধ পরিবেশ, সীমিত স্বাধীনতা, পর্যাপ্ত কাউন্সেলিংয়ের অভাব—সব মিলিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া একজন নারী সেখানে নতুন করে নিজেকে গড়ে তোলার সুযোগ খুব কমই পান। ফলে ‘উদ্ধার’ শব্দটি অনেক সময় তার কাছে কেবল স্থান পরিবর্তন ছাড়া আর কিছুই নয়।
কাগজে আইন, বাস্তবে শূন্যতা
বাংলাদেশে নারী সুরক্ষায় একাধিক আইন রয়েছে—পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, মানব পাচার প্রতিরোধ আইন—সবই আছে। কিন্তু প্রয়োগের ঘাটতিই এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা। আদালত থেকে ‘প্রোটেকশন অর্ডার’ পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা খুব কমই কার্যকর হয়।
কর্মক্ষেত্রে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ২০০৯ সালের হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায় এবং পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশ অনুযায়ী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ কেন্দ্র বা সেল থাকার কথা। বাস্তবে তা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। যে কয়টি প্রতিষ্ঠানে কমিটি আছে, সেগুলোও প্রভাবশালীদের চাপে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো—সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। অনেক সময় অপরাধীর বদলে ভুক্তভোগীকেই দায়ী করা হয়। পরিবারও অনেক ক্ষেত্রে তাকে গ্রহণ করতে চায় না। ফলে আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে সে পড়ে আরও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে।
পুনর্বাসনের অভাব—ফিরে যাওয়া সেই অন্ধকারেই
উদ্ধারের পর একজন নারীর জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো পুনর্বাসন। কিন্তু বাস্তবে এ ক্ষেত্রটি সবচেয়ে অবহেলিত। বিকল্প কর্মসংস্থান, আর্থিক সহায়তা বা দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের সুনির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রীয় কাঠামো নেই।
ফলে অনেক নারী বাধ্য হয়ে আবার ফিরে যান সেই পুরোনো অন্ধকার জগতে—যেখান থেকে তারা একসময় বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলেন।
প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
নারীর সুরক্ষাকে কার্যকর করতে হলে পুরো প্রক্রিয়াটিকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। উদ্ধার থেকে শুরু করে পুনর্বাসন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপকে যুক্ত করে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রয়োজন:
তা হতে পারে এমন– উদ্ধার ➔ স্বাস্থ্য পরীক্ষা ➔ মানসিক কাউন্সেলিং ➔ আইনি সহায়তা ➔ নিরাপদ আশ্রয় ➔ বিকল্প কর্মসংস্থান ➔ সমাজে সসম্মানে পুনর্মিলন। এই রোডম্যাপ বাস্তবায়নে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ–
১. কমিউনিটিভিত্তিক শেল্টার হোম: জেলখানার মতো সরকারি সেফহোমের বদলে প্রতিটি উপজেলা ও জেলায় খোলামেলা, নিরাপদ এবং বাসযোগ্য ‘কমিউনিটিভিত্তিক শেল্টার হোম’ গড়ে তুলতে হবে। মেয়েরা কমিউনিটির কাছাকাছি থাকলে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরা সহজ হয়।
২. বাজেটে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ: নারী পুনর্বাসন এবং তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য জাতীয় বাজেটে আলাদা ও পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
৩. ভিকটিম ও উইটনেস প্রোটেকশন আইন: বিচার চলাকালীন নারী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত ‘ভিকটিম ও উইটনেস প্রোটেকশন অ্যাক্ট’ প্রণয়ন ও তার কঠোর বাস্তবায়ন জরুরি।
৪. হাইকোর্টের নির্দেশনার প্রয়োগ: কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে হাইকোর্টের নির্দেশিকা ও অধ্যাদেশ কেবল কাগজে নয়, বাস্তবে কার্যকর করতে হবে এবং নিয়মিত সরকারি নজরদারি চালাতে হবে।
৫. স্পিডি ট্রায়াল বা দ্রুত বিচার: মামলা দিনের পর দিন চলতে থাকলে ভুক্তভোগী হাল ছেড়ে দেন। তাই নারী নির্যাতনের মামলাগুলোয় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে প্রো-অ্যাকটিভ বিচারক ও কাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন।
নারীর জন্য একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বাস্তব প্রয়োগ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন।
যে নারী অন্ধকার থেকে ফিরে আসে, তার জন্য ‘উদ্ধার’ যেন নতুন বন্দিত্বের শুরু না হয়—বরং সেটিই হোক মুক্তির প্রকৃত দরজা। তখনই সে সত্যিকার অর্থে মাথা উঁচু করে বাঁচার সুযোগ পাবে।



