বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ২০ মে, ২০২৬
এডিটরস পিক

আইসল্যান্ডে ‘আইস’ নেই, গ্রীনল্যান্ডে ‘গ্রীন’ নেই- এমন নামকরণের নেপথ্যে কি?

1-iceland-greenland

গ্রিনল্যান্ড সবুজে ঢাকা কোনো জায়গা নয় এবং আইসল্যান্ডও নামের মতোই বরফাবৃত নয়। শুনলে সত্যিই অবাক হবেন, গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ৮০ ভাগ অঞ্চলই স্থায়ী বরফে আবৃত। অন্যদিকে, আইসল্যান্ডের মাত্র ১১ ভাগ অংশ বরফে ঢাকা। গ্রিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের এই ‘প্যারাডক্স’ ধরনের নাম ও বৈশিষ্ট্য খুব স্বাভাবিক কারণেই বিখ্যাত গোটা পৃথিবী জুড়ে। আপনি কি কখনো ভেবেছেন, কেন এই রকম অদ্ভুত নামকরণ?

নামকরণের এই ব্যাপারটি ছিলো সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃত। ভাইকিংরা যখন প্রথম এই ভূখণ্ড দুটিতে পা রাখে, তখনই নিজেদের খাতিরে একটু বুদ্ধি খাটিয়ে সবকিছু বিপরীত দিকে পরিচালিত করলো। ভাইকিংরা সবুজ ভূখণ্ডটির নাম দিলো আইসল্যান্ড। কারণ উর্বর ও অনুকূল আবহাওয়ার অঞ্চলটি যেন সকলের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে এবং খুব বেশি লোকারণ্যে পরিণত না হয়। অন্যদিকে কঠিন বরফে আবৃত ভূখণ্ডটির নামকরণ করা হলো গ্রিনল্যান্ড, এই প্রতিকূল পরিবেশের দ্বীপটি কে দখল করতে গেলো কিংবা বসবাস করতে লাগলো তা নিয়ে খুব একটা মাথা না ঘামালেও চলতো। কিন্তু বাস্তবতা মাত্র তিন-চার বাক্যের মতোই সহজ নয়, নামকরণের পিছনে রয়েছে জটিল ঘটনাবলী, যার সাথে জড়িত রয়েছে জলবায়ুর পরিবর্তন ও ভাইকিং প্রথা। নামকরণের এই উপাখ্যান লোকগাঁথা ও উপকথার মতো প্রচলিত।

ভৌগোলিক দিক

উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র আইসল্যান্ড। শীতকালে দেশটির তাপমাত্রা সাধারণত শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে থাকে এবং গ্রীষ্মকালে থাকে ১০-১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের উপসাগরীয় স্রোত উষ্ণ জল ও বাতাস বয়ে আনে, যা দ্বীপটিকে অস্বাভাবিকভাবে মৃদু রাখে। এই স্রোত মেরু অঞ্চলের ঠান্ডা বাতাস এবং গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের উষ্ণ বায়ুর সঙ্গে মিশে ঘন ঘন আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটায়। এ কারণে দেশটির দক্ষিণ উপকূল উষ্ণ ও আর্দ্র, উত্তর অপেক্ষাকৃত শুষ্ক ও শীতল থাকে। আবার অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বৃষ্টিপাত বেশি হয়।

অন্যদিকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড উত্তর আমেরিকায় অবস্থিত। তবে এটির প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ইউরোপিয়ানদের হাতে। দেশটির বেশির ভাগ অংশ আর্কটিক সার্কেলের ওপরে হওয়ায় তা মেরু অঞ্চলের ঠান্ডা বাতাস ও কম সূর্যালোকের কারণ। গ্রীষ্মকালে সাধারণ তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হয় না আর শীতকালে তা নেমে হয় মাইনাস ২০ ডিগ্রি থেকে মাইনাস ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। ভেতরের বরফের চাদরের তাপমাত্রা সারা বছর হিমাঙ্কের নিচে থাকে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

লোককথায় প্রচলিত আছে, যখন নরওয়েজিয়ান ভাইকিংসদের প্রথম দলটি আইসল্যান্ড আবিষ্কার করে, তখন ওই স্থানে প্রবল তুষারপাত হচ্ছিল। এ কারণে নাম রাখা হয় ‘স্নো ল্যান্ড’। পরে সুইডিশ ভাইকিং গারোর সভাভারোসন গিয়ে সেটির নামকরণ নিজের নামে করেন ‘গারোর ল্যান্ড’। পরে ফ্লোকি নামে আরও এক ভাইকিংস সেখানে বসতি স্থাপন করতে যান। কিন্তু তাঁর ভাগ্য এতটা সুপ্রসন্ন ছিল না। নৌকা দিয়ে যাওয়ার সময় সমুদ্রপথে তাঁর মেয়ে ডুবে মারা যায়, সঙ্গে থাকা সব পশুপাখিও মারা যায়। এ কারণে ওই ভূখণ্ডে পৌঁছে চরম হতাশ হয়ে পড়েন তিনি। সেখানে দেখতে পান এক বিশাল বরফখণ্ড। সেটি দেখেই আইসল্যান্ড নামকরণ করেন।

ধারণা করা হয়, ফ্লোকি চাননি এই ভূখণ্ডে কেউ বসবাস করুক। এ জন্য নরওয়ে ফিরে গিয়ে প্রচারণা চালাতে থাকেন যে দ্বীপটি বরফে ঢাকা এবং বসবাসের অনুপযোগী। তবে তাঁর এক সঙ্গী প্রচারণা চালান যে দ্বীপটি দারুণ উর্বর এবং সবুজে ভরপুর। সেই থেকে মানুষের বসতি বাড়তে থাকে।

আরও একটি লোককাহিনি আছে। যেখানে বলা হয়, আইসল্যান্ড আবিষ্কার করতে গিয়ে সেখানের জায়গা দখল নিয়ে ভাইকিংসদের দুই গ্রুপে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। তখন একদল নতুন ভূখণ্ডের বেরিয়ে যান। তাঁরা পরে যে ভূখণ্ডটি আবিষ্কার করেন, সেটি বরফে আচ্ছাদিত থাকলেও নতুন বসতি স্থাপন করার জন্য মানুষকে আকৃষ্ট করতে গ্রিনল্যান্ড বলে প্রচারণা চালাতে থাকে। এভাবেই দ্বীপটির নাম মানুষের মুখে মুখে পৌঁছে যায়।

আইসল্যান্ডগ্রীনল্যান্ডরহস্য