সেচে ডিজেল সংকটে বোরো মৌসুমে দুশ্চিন্তায় কৃষক, হুমকির মুখে খাদ্য নিরাপত্তা

ভোরের আলো ফোটার আগেই সাইকেলে চেপে বের হয়েছিলেন কৃষক কবির হোসেন। লক্ষ্য একটাই—ডিজেল। নড়াইল সদর উপজেলার মাছিমদিয়া থেকে শহরের এক পাম্প, সেখান থেকে আরেক পাম্প। কিন্তু কোথাও নেই সেই কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, ড্রাম তখনও খালি। সামনে বোরো ধানের ক্ষেত, তৃষ্ণার্ত জমি—আর কৃষকের চোখে অনিশ্চয়তার ছায়া।
‘আমার নিজের ধানও যাচ্ছে, অন্যদেরও যাচ্ছে। গাড়িআলারা তেল পাচ্ছে, আমরা কৃষকরা পাচ্ছিনে। আমরা তো আর তেল নিয়ে নষ্ট করিনে।’ কবিরের কণ্ঠে হতাশা নয় বরং এক ধরনের অসহায়তা। এই গল্প শুধু তার একার নয় দেশের উত্তরাঞ্চল, হাওর কিংবা দক্ষিণ-পশ্চিম—সবখানেই যেন একই সুর।
বোরো মৌসুমের হৃদস্পন্দন থমকে যাওয়ার শঙ্কা
বাংলাদেশের কৃষির প্রাণ হলো বোরো ধান। বছরে উৎপাদিত মোট চালের প্রায় ৬০ শতাংশই আসে এই ফসল থেকে। আর এই বোরো পুরোপুরি নির্ভর করে সেচের ওপর। ফেব্রুয়ারি থেকে মে—এই সময়টায় জমিতে নিয়মিত পানি না দিলে ফলন মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে ৭৫৪টি গভীর নলকূপ, ১০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৩৭টি অগভীর নলকূপ এবং এক লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৪টি লো-লিফট পাম্প আছে। এসবের বড় অংশই ডিজেলচালিত। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল ও হাওর এলাকায় ডিজেল ছাড়া সেচ প্রায় অসম্ভব।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে রবি মৌসুমে প্রায় ৫০ লাখ হেক্টর জমিতে সেচনির্ভর ফসলের চাষ হয়। চলতি মৌসুমে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫০ লাখ ৫৪ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে ৮ মার্চ পর্যন্ত ৪৮ লাখ ৫৩ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। শুধু রংপুর অঞ্চলেই পাঁচ লাখ ৯ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে, যার ৩৫-৪০ শতাংশ পুরোপুরি ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল।
তবে সরকার বলছে, দেশে সেচের জ্বালানির সংকট নেই। তেলের অভাবে কোথাও সেচকাজ ব্যাহত হয়নি। সরকারের তরফে আশ্বস্ত করে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ এখন আর জ্বালানির জন্য এককভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল নয়। ইতোমধ্যে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে বাংলাদেশ এখন আর পুরোপুরি মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, সিঙ্গাপুর থেকে ৪১ শতাংশ, ২৪ শতাংশ মালয়েশিয়া, ১৪ শতাংশ ভারত, ২১ শতাংশ অন্যান্য দেশ থেকে ডিজেল আসছে। তবু বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব পড়েছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বোরো উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। উৎপাদন কমে গেলে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। চালের বাজারেও এর প্রভাব পড়বে।
বিশ্লেষকরা কৃষির জন্য আলাদা ডিজেল বরাদ্দ, ড্রাম ব্যবহারকারীদের জন্য তেল বিক্রির স্পষ্ট নির্দেশনা, মাঠ পর্যায়ে কঠোর নজরদারি, ডিজেলে ভর্তুকি ও বিদ্যুৎচালিত সেচ সম্প্রসারণের পরামর্শ দিয়েছেন।

মাঠের বাস্তবতা বনাম সরকারি আশ্বাস
সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে সেচের জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ‘তেলের অভাবে কোথাও সেচ বন্ধ হয়নি।’
কিন্তু মাঠের চিত্র যেন ভিন্ন গল্প বলছে।
ঠাকুরগাঁও, সিরাজগঞ্জ, কুড়িগ্রাম—প্রতিটি অঞ্চল থেকেই আসছে একই অভিযোগ: তেল নেই, বা থাকলেও চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। ফলে কৃষকের মনে তৈরি হয়েছে এক ধরনের আতঙ্ক—আজ না পেলে কাল কি পাওয়া যাবে?
খাদ্য নিরাপত্তায় সম্ভাব্য ঝুঁকি
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব শুধু কৃষকের ক্ষেতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। মোট জমির প্রায় ৬০ শতাংশের সেচে ব্যবহার হয় শ্যালো পাম্প। বাকিটা গভীর নলকূপ ও লো-লিফট পাম্প দিয়ে সেচ হয়। দেশে চলমান প্রায় ১৪ লাখ শ্যালো পাম্পের মধ্যে প্রায় ১১ লাখই চলে ডিজেল পুড়িয়ে। বাকি লাখ তিনেক বিদ্যুৎচালিত। এগুলো বেশ কিছুর আবার স্ট্যান্ডবাই ডিজেল ইঞ্জিনও রাখতে হয়, যাতে প্রচণ্ড গরমের সময় বোরো ধানের থোড় আসার সময় বিদ্যুৎ চলে গেলেও অতি আবশ্যকীয় সেচকাজ অব্যাহত রাখা যায়। একটি শ্যালো পাম্প চালাতে পুরো বোরো মৌসুমে গড়পড়তা ৩০০ লিটার ডিজেল লাগে। তবে তা জমির পরিমাণ ও মাটিভেদে কমবেশি হতে পারে।
সেচ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে
- বোরো উৎপাদন কমে যেতে পারে
- চালের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে
- খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে
বিশেষজ্ঞরা কিছু তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের কথা বলছেন—
- কৃষকদের জন্য আলাদা ডিজেল বরাদ্দ
- ড্রাম বা জারিকেনে তেল বিক্রির স্পষ্ট নীতিমালা
- মাঠ পর্যায়ে কঠোর নজরদারি
- ডিজেলে ভর্তুকি বৃদ্ধি
- বিদ্যুৎচালিত সেচের সম্প্রসারণ
অপেক্ষা বৃষ্টির, নাকি সিদ্ধান্তের?
কৃষক এখন আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন—বৃষ্টি হবে কি না। কিন্তু শুধু বৃষ্টি নয়, প্রয়োজন কার্যকর নীতি ও দ্রুত পদক্ষেপ। কারণ, জমির ফাটলে শুধু পানির অভাব নয়—সেখানে জমে উঠছে অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ আর ভবিষ্যতের ভয়।



