বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬
নারী

কর্মক্ষেত্রের দ্বিতীয় অধ্যায়

কর্মক্ষেত্রের দ্বিতীয় অধ্যায়

ক্যারিয়ার কি একবার থেমে গেলে শেষ? আমাদের সমাজের প্রচলিত ধারণা যেন ঠিক সেটাই বলে—বিশেষ করে যদি সেই মানুষটি একজন নারী হন। পুরুষের ক্ষেত্রে কর্মজীবনের বিরতি অনেক সময় ‘নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার সময়’ হিসেবে বিবেচিত হলেও, নারীর ক্ষেত্রে তা হয়ে ওঠে সন্দেহ, অবিশ্বাস আর অদৃশ্য বাধার এক দীর্ঘ তালিকা। মাতৃত্ব, সংসার বা পারিবারিক দায়িত্ব—যে কারণেই হোক, কর্মক্ষেত্র থেকে সরে দাঁড়ানো মানেই যেন তার পেশাজীবনের ইতি।

কিন্তু বাস্তবতা কি এত সরল? নাকি এই ধারণার আড়ালে চাপা পড়ে আছে অসংখ্য অদেখা সম্ভাবনা?

সংখ্যায় ফুটে ওঠা বাস্তবতা
লাখো নারী যোগ্যতা ও মেধা থাকা সত্ত্বেও কেবল দীর্ঘ বিরতির কারণে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু করতে পারেন না। বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতির জন্য এটি একটি অশনিসংকেত।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপের দিকে তাকালে হতাশার চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়। দেশে শ্রমশক্তিতে পুরুষের অংশগ্রহণের হার যেখানে প্রায় ৭৯ শতাংশ, সেখানে নারীর অংশগ্রহণ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২০ শতাংশে। অথচ ২০২৩ সালেও এই হার ছিল প্রায় ২৩ শতাংশ। অর্থাৎ, নারীরা কর্মমুখী হওয়ার বদলে উল্টো শ্রমবাজার থেকে ছিটকে পড়ছেন।

Advertisements

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ২০২৪ সালের জুনে প্রকাশিত ‘বৈশ্বিক জেন্ডার অসমতা’ প্রতিবেদন বলছে আরও ভয়াবহ কথা। অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ, শিক্ষার সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবা ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন–এই চার সূচকে গত পাঁচ বছরে শ্রমশক্তিতে নারী-পুরুষের বৈষম্য তো কমেইনি বরং আয়ের ক্ষেত্রে এই অসমতা বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ! নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ছাড়া একটি রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন যে নিছকই কথার কথা, তা এই পরিসংখ্যানগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

ব্র্যাকের এক কর্মসূচির আবেদন প্রক্রিয়া থেকে পাওয়া উপাত্ত নারীদের কর্মজীবন থেকে ছিটকে পড়ার প্রকৃত কারণগুলো নিখুঁতভাবে তুলে এনেছে। আবেদনকারীদের ৩৮ দশমিক ৮ শতাংশই জানিয়েছেন, পারিবারিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তারা চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। মাতৃত্বকালীন সময়ের জটিলতা ও সন্তান লালন-পালনের জন্য চাকরি ছেড়েছেন ৩৬ শতাংশ নারী। অর্থাৎ, সমাজের অবৈতনিক পরিচর্যার সিংহভাগ দায়ভার কেবল নারীর কাঁধেই বর্তায়। এর বাইরে ব্যক্তিগত কারণ (১৮.৮ শতাংশ), উচ্চশিক্ষা (১৪.৪ শতাংশ), বিরূপ ও নারীবান্ধব নয় এমন কর্মপরিবেশ (৮.৫ শতাংশ) এবং সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক চাপ (৪.৭ শতাংশ) নারীর ক্যারিয়ারের পথে বড় অন্তরায়।

সবকিছু ছাপিয়ে এই নারীরা যখন পুনরায় ফিরতে চান, তার পেছনে কেবলই কি অর্থোপার্জন কাজ করে? তথ্য বলছে, না। বিরতির পর কাজে ফেরার ক্ষেত্রে তাদের মূল অনুপ্রেরণা হলো–ক্যারিয়ারে উন্নতি (৭৬.৫ শতাংশ), নিজস্ব আত্মপরিচয় বা আইডেনটিটি তৈরি (৬২.২ শতাংশ), হারানো আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার (৫৭.৭ শতাংশ), আর্থিক স্বাধীনতা (৫৬.৫ শতাংশ) এবং পরিবারের অর্থনীতিতে অবদান রাখা (৪২.৭ শতাংশ)।

কেন থেমে যান নারীরা?
কারণগুলো খুব পরিচিত—
সংসারের দায়িত্ব, সন্তান লালন-পালন, সামাজিক চাপ, কর্মক্ষেত্রের অনুকূল পরিবেশের অভাব।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই সিদ্ধান্ত নারীরা ‘নিজে’ নেন না বরং পরিস্থিতি তাদের নিতে বাধ্য করে। ফলে কর্মজীবনের বিরতি হয়ে ওঠে এক ধরনের ‘অদৃশ্য মূল্য’, যা তাদের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারকে প্রভাবিত করে।

তবু ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা
তবে আশার জায়গাটি এখানেই—নারীরা ফিরতে চান। শুধু অর্থের জন্য নয়, নিজের পরিচয় ফিরে পাওয়ার জন্য, আত্মবিশ্বাস পুনর্গঠনের জন্য, নিজের সক্ষমতাকে আবার প্রমাণ করার জন্য।

এই ফিরে আসার পথটাকে সহজ করতে পরিবর্তনটা আনতে হবে আমাদের মানসিকতায়। কাজ থেকে বিরতি নেওয়া কোনো দুর্বলতা নয়—এটি জীবনের একটি স্বাভাবিক অধ্যায়।

একজন নারী যখন পরিবারকে সময় দেন, সন্তান বড় করেন, বা নিজের জন্য কিছু সময় নেন—তখন তিনি হারান না বরং নতুনভাবে প্রস্তুত হন। এই অভিজ্ঞতাগুলোই তাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

দ্বিতীয় অধ্যায়ই হতে পারে সবচেয়ে শক্তিশালী
ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় অধ্যায় অনেক সময় প্রথমটির চেয়েও বেশি পরিণত, বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং বেশি অর্থবহ হয়ে ওঠে। কারণ এই পর্যায়ে একজন মানুষ জানেন তিনি কী চান, কেন চান।

নারীর কর্মজীবনে এই ‘দ্বিতীয় শুরু’কে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারলেই বদলে যেতে পারে সামগ্রিক অর্থনীতি, বদলে যেতে পারে সমাজের চিত্রও।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুব সহজ—
আমরা কি একজন নারীর সম্ভাবনাকে তার অতীত দিয়ে বিচার করব, নাকি তার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ দিয়ে?

উত্তরটাই ঠিক করে দেবে, কতটা এগোবে আমাদের সমাজ।

Advertisements
কর্মক্ষেত্রনারী