বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনমঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬
বিবিধ

সৌদি আরবের একদিন পরে কেন বাংলাদেশে ঈদ?

সৌদি আরবের একদিন পরে কেন বাংলাদেশে ঈদ?

বাংলাদেশে ঈদ সৌদি আরবের একদিন পরে হয় কেন—এই প্রশ্নটি প্রায়ই মানুষের মনে আসে, বিশেষ করে ঈদের সময় ঘনিয়ে এলে। অনেকেই ভাবেন, যেহেতু সৌদি আরব আমাদের পশ্চিমে অবস্থিত এবং সময়ের পার্থক্য মাত্র তিন ঘণ্টা, তাহলে তো আমাদের আগে ঈদ হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, আমরা প্রায়ই একদিন পরে ঈদ উদ্‌যাপন করি। এর পেছনে রয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞানের কিছু মৌলিক ব্যাখ্যা, যা বুঝলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়।

প্রথমেই বুঝতে হবে সৌরবর্ষ ও চন্দ্রবর্ষের পার্থক্য। পৃথিবী সূর্যের চারপাশে একবার ঘুরতে প্রায় ৩৬৫ দিন সময় নেয়—এটাই সৌরবর্ষ। একই সঙ্গে পৃথিবী নিজ অক্ষে ঘুরে ২৪ ঘণ্টায় একটি দিন সম্পন্ন করে। অন্যদিকে চাঁদ পৃথিবীর চারপাশে ঘুরে এবং এই ঘূর্ণনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয় চন্দ্রমাস। চাঁদ পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করতে প্রায় ২৭.৩ দিন সময় নিলেও নতুন চাঁদ দেখা যায় গড়ে প্রায় ২৯.৫ দিন পর। কারণ, চাঁদকে দৃশ্যমান হতে হলে সূর্য ও চাঁদের মধ্যে অন্তত ১০.৫ ডিগ্রি কোণ তৈরি হওয়া জরুরি।

চাঁদের এই ঘূর্ণনের কারণে চন্দ্রমাস কখনো হয় ২৯ দিনে, আবার কখনো ৩০ দিনে। এভাবে ১২ মাস হয়। অর্থাৎ ১২ বার নতুন চাঁদ ওঠে। ঈদের ঠিক আগে এরকম একটি নতুন চাঁদের অপেক্ষায় থাকি আমরা। যাই হোক, চন্দ্রমাসের হিসেব অনুসারে বছর হতে ৩৬৫ দিন লাগে না। লাগে ৩৫৪ বা ৩৫৫ দিন। ফলে সৌরবর্ষের সঙ্গে প্রায় ১০ বা ১১ দিনের পার্থক্য দেখা যায়। আরবি ক্যালেন্ডারে এই পার্থক্যটা আর পূরণ করা হয় না। ফলে প্রতিবছর ঈদ ১০ বা ১১ দিন করে এগিয়ে আসে।

এখন আসা যাক মূল প্রশ্নে। আমরা সময়ের পার্থক্য হিসাব করি সূর্যের অবস্থান অনুযায়ী। অর্থাৎ কোথায় আগে সূর্য ওঠে, কোথায় পরে—সেই অনুযায়ী সময় নির্ধারিত হয়। এই হিসাবে বাংলাদেশ সৌদি আরবের চেয়ে তিন ঘণ্টা এগিয়ে। কিন্তু ঈদ নির্ধারণ হয় চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে, সূর্যের ওপর নয়। এখানেই মূল পার্থক্য।

পৃথিবীর ঘূর্ণনটাও একটু জানতে হবে। পৃথিবী ঘোরে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে। ফলে সূর্যোদয় হয় পূর্বে আর অস্ত যায় পশ্চিমে। একইভাবে চাঁদও ঘোরে। কিন্তু পৃথিবী থেকে দেখলে চাঁদকে পশ্চিম আকাশে আগে দেখা যায়।

তাহলে পার্থক্য ৩ ঘণ্টা হলেও আমরা কেন একদিন পরে ঈদ পালন করি? কারণ যে তিন ঘণ্টা পার্থক্যের কথা বলছি, তা তো সূর্যের হিসেবে। চাঁদের হিসেবে এই পার্থক্যটা আসলে ২১ ঘন্টার। ফলে ঈদ যেহেতু চন্দ্রবর্ষের হিসাবে হয়, তাই হিসেবটাও করতে হবে চন্দ্রবর্ষ ধরে। আর ইতিমধ্যেই বলেছি, চাঁদ দেখার ক্ষেত্রে পার্থক্য আসলে ৩ ঘণ্টার নয়, ২১ ঘণ্টার। অর্থাৎ বাংলাদেশের ২১ ঘণ্টা আগে চাঁদ দেখা যায় সৌদি আরবের আকাশে।

আরেকটা প্রশ্ন আপনার মাথায় আসতে পারে। বুঝলাম, সৌদি আরব বাংলাদেশের পশ্চিমে অবস্থিত, তাই সে দেশে আগে চাঁদ দেখা যায় এবং আগে ঈদ হয়। কিন্তু যে দেশ বাংলাদেশের পূর্বে অবস্থিত, যেমন জাপান কিংবা ইন্দোনেশিয়া—সেখানে কেন বাংলাদেশের একদিন আগে ইদ হয়? অর্থাৎ সৌদি আরব বাংলাদেশের পশ্চিমে অবস্থিত, আর জাপান পূর্বে। তাহলে দুটি দেশ একই দিনে ঈদ পালন করে কীভাবে? বাংলাদেশই-বা মাঝে থেকে কেন একদিন পরে ঈদ পালন করে? এর সম্ভাব্য দুটি কারণ আছে।

প্রথমটা হলো, বাংলাদেশের চেয়ে জাপানে সূর্যাস্ত হয় আগে। অর্থাৎ যখন বাংলাদেশে চাঁদ দেখার কথা, তখন সূর্যের আলো থাকে। ফলে আমরা চাঁদ দেখতে পারি না। কিন্তু ইন্দোনেশিয়া কিংবা জাপানের মতো পূর্বের দেশগুলোতে তখন থাকে সন্ধ্যা। ফলে তারা ঠিকই চাঁদ দেখতে পারে। শুধু সূর্যের আলোর কারণেই আমরা চাঁদ দেখতে পারি না। পরদিন চাঁদ আবার উঠলে আমরা সেই চাঁদ দেখি। এ কারণে জাপান বা ইন্দোনেশিয়া আমাদের পূর্বে থেকেও একদিন আগে পশ্চিমাদের সঙ্গে ঈদ পালন করতে পারে।

আর দ্বিতীয় কারণটা হলো, খালি চোখে চাঁদ দেখতে হলে চাঁদ ও সূর্যের মধ্যবর্তী কোণ হতে হয় ১০.৫ ডিগ্রি। ফলে জাপানে যখন সূর্য ও চাঁদের মধ্যবর্তী কোন ১০.৫ ডিগ্রি হয়, বাংলাদেশে তখন হয় না। এই কোণ হতে যে পরিমাণ পথ পাড়ি দিতে হয়, তাতে চাঁদের প্রায় ১৭ থেকে ২৪ ঘণ্টা লেগে যায়। তাই আমরা জাপানের চেয়ে পরে চাঁদ দেখি।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, যেসব দেশ বাংলাদেশের চেয়ে পশ্চিমে অবস্থিত, তারা আমাদের চেয়ে আগে ঈদ করে। আবার যারা পূর্বে অবস্থিত, তারাও। মাঝে থেকে বাংলাদেশ ঈদ পালন করে তাদের চেয়ে একদিন পরে!

ঈদসৌদি আরব