যুদ্ধ ও সহিংসতা অর্থনীতিতে কীভাবে প্রভাব ফেলে

২০২৬ সালের শুরু থেকেই বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতি এক অস্থির পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির টানাপোড়েন, সংঘাত ও যুদ্ধের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতি নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হওয়ায় এই দুই ক্ষেত্রের যেকোনো পরিবর্তন একে অপরকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হলে প্রথমেই দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যায়, দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ হ্রাস পায় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর হয়ে যায়। আবার দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থাও রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে, যার ফলে সরকার পরিবর্তন বা ক্ষমতার সংকট তৈরি হয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা দেখলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। দীর্ঘদিনের সংঘাতের কারণে সিরিয়ার অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গৃহযুদ্ধের ফলে সেখানে খাদ্যসংকট, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং জ্বালানির ঘাটতি তৈরি হয়েছে। একইভাবে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক অস্থিরতাও তাদের অর্থনীতিকে দুর্বল করে দিয়েছে এবং ব্যাপক জনঅসন্তোষের জন্ম দিয়েছে।
বর্তমান বিশ্বে ক্ষমতার ভারসাম্যও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা দেশগুলো বৈশ্বিক রাজনীতিতে প্রভাবশালী থাকলেও এখন এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার উদীয়মান অর্থনীতিগুলো নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে। ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ক্রমশ সহযোগিতার চেয়ে প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি, রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে।
যুদ্ধ শুরু হলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। পণ্য পরিবহন, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ধীর হয়ে যায়। উদাহরণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে। এতে বিশ্ব তেল বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং অনেক তেলবাহী জাহাজ আটকা পড়েছে। এই রুট দিয়ে এশিয়ার বড় অংশের জ্বালানি সরবরাহ হয়, তাই এর প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। ইতোমধ্যে ইউরোপের অনেক দেশে গ্যাসের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে এবং ডিজেলের দামও বেড়েছে। জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়ে, ফলে শিল্প ও পরিবহন খাতের ওপর চাপ পড়ে এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
যুদ্ধের প্রভাব শুধু জ্বালানি বা শিল্পেই সীমাবদ্ধ থাকে না; পর্যটন ও ধর্মীয় ভ্রমণেও এর প্রভাব পড়ে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওমরাহ যাত্রী কমে গেছে, যার ফলে মক্কা ও মদিনার হোটেল ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। পর্যটন নির্ভর অর্থনীতির জন্য এটি বড় ধাক্কা।
রাজনৈতিক অস্থিরতা কৃষি খাতেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে কৃষকদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায় এবং বাজারে দামের ওঠানামা বাড়ে। বীজ, সার ও জ্বালানির দাম বাড়লে খাদ্য উৎপাদন কমে যেতে পারে। ফলে খাদ্যের দাম বৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
অর্থনৈতিক অস্থিরতা আর্থিক খাতেও প্রভাব ফেলে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়লে শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায় এবং বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি নিতে চান না। এতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তারল্য সংকট তৈরি হতে পারে এবং নতুন বিনিয়োগ কমে যায়।
আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রায় ৭.১ শতাংশ শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও ২০২৬ সালে তা কমে ৬.২ শতাংশ হতে পারে। এর মূল কারণ হিসেবে ভারতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ আমদানি শুল্কের প্রভাবকে দায়ী করা হয়েছে। এখন নতুন করে প্রভাব ফেলতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি।
উপরন্তু ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক হামলা এবং এর জবাবে মার্কিন ঘাঁটিগুলোয় পাল্টা আক্রমণের মধ্যেই ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করেছে। প্রায় ৭০৬টি ট্যাংকার আটকা পড়ে আছে। এর মধ্যে ৩৩৪টি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ, ১০৯টি ‘ডার্টি’ বা মিশ্রিত জ্বালানি পণ্যবাহী ট্যাংকার এবং ২৬৩টি ‘ক্লিন’ বা পরিচ্ছন্ন জ্বালানিবাহী জাহাজ (সূত্র: রয়টার্স এনডিটিভি)।
এই তেলের বেশিরভাগই যায় এশিয়ায়। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে যেকোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তা বিশ্ব তেল বাণিজ্যে চরম অস্থিরতা তৈরি করে। আর যদি এই পরিস্থিতি সপ্তাহজুড়ে চলতে থাকে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশ এমনকি পূর্ব এশিয়ার পরাশক্তি চীনের জন্যও বিপাকের কারণ হবে।
বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি আগামী বছরগুলোতে ধীরগতির হতে পারে। ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩.৩ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৩.২ শতাংশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব পড়ছে। দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ধীরগতির বেসরকারি বিনিয়োগ এবং স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ অর্থনীতিকে চাপে ফেলছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৮.৫৮ শতাংশ। এছাড়া রাজনৈতিক পরিবর্তন, বন্যা এবং বৈদেশিক চাহিদা কমে যাওয়াও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলেছে।
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় স্বাধীন অর্থনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের হিসাব অনুযায়ী বৈশ্বিক ঝুঁকি সূচকে ১৬৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১৪১তম। চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কমে ৪.৫ শতাংশ এবং আগামী বছর ৫.৭ শতাংশ হতে পারে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ শতাংশ। রাজনৈতিক অস্থিরতা, গণ-অভ্যুত্থানে পটপরিবর্তন, বিভিন্ন জেলায় ভয়াবহ বন্যা এবং বৈদেশিক চাহিদার মন্দা এতে ভূমিকা রেখেছে।
বর্তমান বিশ্ব অস্থিতিশীল ভূ-রাজনীতির মধ্য দিয়ে নতুন অর্থনৈতিক শক্তির সমীকরণে এগোচ্ছে, যেখানে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সার্বিকভাবে, ২০২৬ সাল একটি অস্থিতিশীল বছর যেখানে যেকোনো বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন সংকটে ফেলতে পারে।
বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তনের এই সময়ে বাংলাদেশের ভূমিকা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নতুন মেরুকরণের এই যুগে কেবল শক্তি নয়, বরং দক্ষ ও কৌশলী দেশগুলোই নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করতে পারবে। বাংলাদেশ যদি এই বাস্তবতা অনুযায়ী প্রস্তুতি নেয় তবে ভবিষ্যতে একটি উল্লেখযোগ্য শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে।



