বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬
বিশ্লেষণ

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ভারতের ওপর বাংলাদেশের বাণিজ্যনির্ভরতা বাড়ার আশঙ্কা

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ভারতের ওপর বাংলাদেশের বাণিজ্যনির্ভরতা বাড়ার আশঙ্কা

বাংলাদেশের আমদানি বাণিজ্যে চীনের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম অংশীদার প্রতিবেশী দেশ ভারত। তুলা, খাদ্যশস্য, জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎসহ নানা পণ্য ও সেবা নিয়মিতভাবে ভারত থেকে আমদানি করা হয়। দুই দেশের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৮৫ শতাংশই মূলত ভারত থেকে আমদানিনির্ভর।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে শুরু করেছে। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ভারতের কাছ থেকে অতিরিক্ত ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। এর অংশ হিসেবে আসামের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে প্রায় পাঁচ হাজার টন ডিজেল বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে, যা পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে ভারতের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে।

সরকারি সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দেশে জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেল, গ্যাস ও এলএনজির সরবরাহ পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও জটিল হলে ভবিষ্যতে জ্বালানির পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের বাজারেও চাপ তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ভারত থেকে আমদানির পরিমাণ ছিল ৯৫৫ কোটি ৫৬ লাখ ডলার। এর আগের অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ৯০০ কোটি ২ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ভারত থেকে আমদানি বেড়েছে প্রায় ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ। আমদানিকৃত পণ্যের মধ্যে তুলা সবচেয়ে বেশি। এছাড়া খাদ্যপণ্য সরবরাহেও ভারতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। যদিও এখনো এসব পণ্যের বৈশ্বিক সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা যায়নি, তবে জ্বালানি সংকটের কারণে খাদ্য উৎপাদনে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

Advertisements

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ আমদানি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের জুলাই–সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের তুলনায় অক্টোবর–ডিসেম্বর প্রান্তিকে ভারত থেকে বেশ কিছু পণ্যের আমদানি বেড়েছে। এর মধ্যে তুলা, খাদ্যশস্য, রেল বা ট্রাম ছাড়া অন্যান্য যানবাহন ও এর যন্ত্রাংশ এবং খনিজ জ্বালানি ও তেলজাত পণ্য উল্লেখযোগ্য। তুলা আমদানি বেড়েছে প্রায় ১ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং খাদ্যশস্য আমদানি বেড়েছে প্রায় ৩১ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এছাড়া খনিজ জ্বালানি ও তেলজাত পণ্যের আমদানি বেড়েছে প্রায় ৬ দশমিক ৩২ শতাংশ।

ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক কতটা গভীর করবে তা সময়ই বলে দেবে। তবে পরিস্থিতির কারণে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের সুযোগ বাড়তে পারে। যদিও যেকোনো পণ্য রফতানির আগে ভারত নিজেদের অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেবে। তিনি মনে করেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হতে পারে।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাজনৈতিক সম্পর্কে টানাপড়েন থাকলেও ভারত থেকে আমদানির ওপর তার বড় প্রভাব পড়েনি। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫–এর তথ্য বলছে, গত অর্থবছরে প্রধান আমদানির উৎসগুলোর মধ্যে ভারতের ক্ষেত্রেই আমদানি ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি ছিল, যা প্রায় ৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

বর্তমানে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার কারণে জ্বালানি তেল, এলপিজি ও এলএনজি আমদানিতে বাংলাদেশের ওপর আর্থিক চাপ বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সহযোগিতার ক্ষেত্রে ভারতের ওপর গুরুত্ব বাড়ানো হচ্ছে। অল্প সময়ের জন্য হলেও ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়তে পারে। কারণ ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করছে এবং সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশও ভারতের কাছ থেকে তেল আমদানি বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে ভোগ্যপণ্য ও তুলা আমদানির ক্ষেত্রেও সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতেও ভারতের ওপর উল্লেখযোগ্য নির্ভরতা রয়েছে। দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৮ শতাংশই ভারত থেকে আমদানি করা হয়। এছাড়া ডিজেল, ফার্নেস অয়েল, জেট ফুয়েল ও অকটেনও আমদানি করা হয় ভারত থেকে। ২০২৬ সালের জন্য ভারত থেকে প্রায় তিন লাখ টন জ্বালানি পণ্য আমদানির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির আওতায় মোট ২ হাজার ৭৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি রয়েছে।

বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা থাকে। এর মধ্যে প্রায় তিন লাখ টন তেল ভারত থেকে পাইপলাইন ও সমুদ্রপথে আমদানি করা হয়। আসামের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে বছরে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল পাইপলাইনের মাধ্যমে আমদানির চুক্তি রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চুক্তির বাইরে আরও প্রায় ৫০ হাজার টন ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা করছে জ্বালানি বিভাগ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব প্রস্তুত করা হয়েছে এবং শিগগিরই তা ভারতের কাছে পাঠানো হতে পারে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালের চুক্তি অনুযায়ী ডিজেল আমদানির লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ২০ হাজার টন। এর মধ্যে বছরের বিভিন্ন সময়ে অতিরিক্ত আমদানির পরিকল্পনাও রয়েছে। বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশের উত্তরাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে মার্চ ও এপ্রিল মাসে অতিরিক্ত ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিপিসির সঙ্গে জিটুজি চুক্তির আওতায় ভারতের ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন লিমিটেড জ্বালানি সরবরাহ করে। এই চুক্তির আওতায় ২০২৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি থেকে মোট ১ লাখ ৫ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির লক্ষ্য রয়েছে।

বর্তমানে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৪ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৫২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসে ভারত থেকে, যা মোট চাহিদার ১৮ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে আদানি গ্রুপ সরবরাহ করছে প্রায় ১ হাজার ৪৫০ থেকে ১ হাজার ৪৭০ মেগাওয়াট এবং ভারতের সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আসছে প্রায় ১ হাজার ৬০ মেগাওয়াট।

সম্প্রতি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এতে আর্থিক খাত, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ও গুরুত্ব পায়।

অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাময় বিভিন্ন খাত নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়েও মতবিনিময় হয়েছে।

Advertisements
বাণিজ্যবাংলাদেশ-ভারত