বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬
বিশ্লেষণ

মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় বিশ্ব অর্থনীতির পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হতে পারে

মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় বিশ্ব অর্থনীতির পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হতে পারে

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার কারণে তেল ও জ্বালানি মূল্য বাড়ার ধাক্কা বিশ্ব অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের গতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, চলতি বছরের জন্য বিশ্ব অর্থনীতিতে যে গতি প্রত্যাশিত ছিল, তা এই সংঘাতের কারণে বিলম্বিত হতে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে চলাচলকারী তেলবাহী ট্যাংকারের নিরাপত্তা নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে এর পরও জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বের প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিশালী দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে বিশ্বজুড়ে খুচরা পণ্যের দাম বাড়তে পারে এবং চলতি বছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস পুনঃমূল্যায়ন করা প্রয়োজন হতে পারে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা জানিয়েছেন, যদি জ্বালানির দাম ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে এক বছর স্থায়ী হয়, তবে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৪০ বেসিস পয়েন্ট বাড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ০.১–০.২ শতাংশ কমে যেতে পারে। জর্জিয়েভা ব্লুমবার্গকে বলেছেন, বিশ্ব অর্থনীতি সত্ত্বেও দারুণ সহনশীলতা দেখিয়েছে এবং বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি বর্তমানে ৩.৩ শতাংশে রয়েছে।

কিছু অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধিই সংকটের একমাত্র কারণ নয়। এদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের শেয়ারের অস্থিরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি শুল্কের কারণে বাজারে আগেই উদ্বেগ ছিল। এখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রভাবে আর্থিক বাজার আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।

Advertisements

নিউইয়র্কভিত্তিক বিনিয়োগ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ লর্ড জিম ও’নিল বলেছেন, বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার মধ্যে এ যুদ্ধ শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি আলাদা রকমের চাপ তৈরি করছে।

ইরান ইতোমধ্যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের বিমানবন্দর, তেল শোধনাগার ও গ্যাস প্ল্যান্টে রকেট এবং ড্রোন হামলা চালিয়েছে। দেশের ৪৫০টির বেশি ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট লক্ষ্য করে হামলা চালালে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

জ্বালানি তেলই মূল কথা
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। অতীতে তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন গবেষণার ওপর ভিত্তি করে ব্লুমবার্গ ইকোনমিকস জানিয়েছে, বাজারে তেলের সরবরাহ ১ শতাংশ কমলে দাম বাড়ে প্রায় ৪ শতাংশ।

তাই এই প্রণালি যদি কয়েক মাসের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, তবে তেলের দাম ইরান যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এতে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম বেড়ে ১০৮ ডলারে পৌঁছাতে পারে।

অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের অনুমান, চলতি বছরের শেষে গিয়ে যুক্তরাজ্য এবং ইউরোজোনে (ইউরোপীয় ইউনিয়নের যেসব দেশ ইউরো ব্যবহার করে) মূল্যস্ফীতি আগের পূর্বাভাসের চেয়ে দশমিক ৫–৬ শতাংশ পয়েন্ট বেশি হতে পারে। গত জানুয়ারিতে যুক্তরাজ্যে মূল্যস্ফীতি ছিল ৩ শতাংশ। আর ফেব্রুয়ারিতে ইউরোজোনে তা ছিল ১ দশমিক ৯ শতাংশ।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে
যুক্তরাষ্ট্রের চলতি বছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস এখনো ২ দশমিক ২ শতাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে। এর কারণ হলো, পাইকারি বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি দেশটির ফ্র্যাকিং (তেল ও গ্যাস উত্তোলনকারী) কোম্পানিগুলোর বড় মুনাফার মাধ্যমে আংশিকভাবে সামলানো হচ্ছে। এসব কোম্পানি দেশটিতে উৎপাদিত গ্যাস চড়া দামে বিক্রি করে বড় অঙ্কের মুনাফা করতে পারবে, যা জ্বালানি আমদানির বাড়তি খরচকে পুষিয়ে দেবে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তারা এখন থেকেই সরাসরি আর্থিক চাপের মুখে পড়ছেন। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় ফিলিং স্টেশনে তেলের দাম এরই মধ্যে বেড়েছে। সাধারণত বিশ্ববাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১ ডলার বাড়লে খুচরা পর্যায়ে তেলের দাম প্রায় ২ দশমিক ৫ সেন্ট বাড়ে।

জ্বালানির মূল্য পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান গ্যাসবাডির তথ্যমতে, শনিবার থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সব জায়গায় প্রতি গ্যালন তেলের দাম গড়ে ১৫ সেন্ট বেড়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী চেয়ারম্যান হিসেবে ট্রাম্পের মনোনীত প্রার্থী কেভিন ওয়ারশ মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় ব্যাংকের নীতিতে পরিবর্তন আনবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগামী মে মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি যদি প্রেসিডেন্টের ইচ্ছা অনুযায়ী চলেন, তবে মূল্যস্ফীতি বাড়লেও সুদ হার কমিয়ে দিতে পারেন। গত সপ্তাহে আর্থিক বাজারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি মাসের বৈঠকে ফেডারেল রিজার্ভের সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সম্ভাবনা প্রায় ৯৭ শতাংশ। তবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারকেরা ইরান সংঘাতের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করবেন।

যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের প্রভাব
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল রিসার্চ জানিয়েছে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ০.২ শতাংশ কমতে পারে। যুক্তরাজ্যের প্রবৃদ্ধি ১.১ শতাংশ থেকে কমে ০.৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে। ইউরোজোনের প্রবৃদ্ধি ১.২ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে কমতে পারে। এই নিম্ন প্রবৃদ্ধি বিনিয়োগ ও সুদের হারে চাপ সৃষ্টি করবে।

যুক্তরাজ্যের রয়্যাল অটোমোবাইল ক্লাব জানাচ্ছে, সংঘাতের পর ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে ৫ পেন্স বেড়ে ১৪৭ পেন্স এবং পেট্রলের দাম ৩ পেন্স বেড়ে ১৩৬ পেন্স হয়েছে।

এ পরিস্থিতি নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি ও সাধারণ মানুষের জীবনের ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। যুক্তরাজ্যের স্থানীয় নির্বাচন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয় হয়ে উঠেছে।

গণমাধ্যমের জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে ৮৮ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক জীবনযাত্রার ব্যয়কে প্রধান সমস্যা মনে করেন। যুক্তরাষ্ট্রে ইউগভের সমীক্ষা দেখাচ্ছে, ৪২ শতাংশ নাগরিক দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দুর্বল মনে করছেন।

ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক (ইসিবি) সতর্ক করেছে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে ইউরোজোনে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে এবং প্রবৃদ্ধি থমকে যাবে। ইসিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট লুইস ডি গুইন্ডোস বলেছেন, ‘আমাদের প্রাথমিক ধারণা ছিল, সংঘাত স্বল্পস্থায়ী হবে। কিন্তু দীর্ঘায়িত হলে মুদ্রাস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে।’

Advertisements
অর্থনীতিমূল্যস্ফীতি