হরমুজ প্রণালি বন্ধ: বিশ্ব খাদ্য ও কৃষিতে সম্ভাব্য ঝুঁকি

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা আবার বিশ্ব অর্থনীতি ও খাদ্য সরবরাহের ওপর ছাপ ফেলছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। যা শুধুমাত্র তেলের বাজারে নয়, সার, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলছে।
বিশ্বের নাইট্রোজেনভিত্তিক ইউরিয়া সার উৎপাদনের প্রায় এক-চতুর্থাংশই হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে পরিবহন হয়। ইউরিয়ার সরবরাহ ব্যাহত হলে ফসলের উৎপাদন কমে যাবে, যার প্রভাব শুধু খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিতে নয় বরং পশুখাদ্য, বায়োফুয়েল শিল্প ও বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনেও পড়বে।
সার সরবরাহে শৃঙ্খল বিপর্যয়
ইরান বিশ্বে ইউরিয়ার রপ্তানিতে চতুর্থ বৃহত্তম দেশ। ইউরিয়া উৎপাদনের ৬০–৮০ শতাংশ খরচ হয় জীবাশ্ম গ্যাসের ওপর। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় এই প্লান্টগুলো কার্যক্রম হারাচ্ছে। ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, বিশ্ববাজারে সারের দাম ইতোমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে। ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় হামলা চালানোর পরও এমন চিত্র দেখা গিয়েছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে মিসরের ইউরিয়ার দামকে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড ধরা হয়। সেটি বর্তমানে ২৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। পণ্যবাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান সিআরইউ গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি টন ইউরিয়ার দাম বর্তমানে ৬২৫ ডলার। গত সপ্তাহে যা ছিল ৪৮৪ থেকে ৪৯০ ডলারের মধ্যে।
এছাড়া, সালফার, অ্যামোনিয়া, বিভিন্ন ধাতু ও শিল্প রাসায়নিকের সরবরাহও এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘমেয়াদে এটি বৈশ্বিক সার সরবরাহ চেইনকে ভেঙে দিতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়া ও আন্তর্জাতিক কৃষিতে প্রভাব
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে ভারত, উপসাগরীয় এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ভারতের ইউরিয়া কারখানাগুলো আংশিকভাবে উপসাগরীয় এলএনজি থেকে সরবরাহ পায়। ব্রাজিল নাইট্রোজেন ও ফসফেট আমদানি করে সয়াবিন ও ভুট্টার উৎপাদন টিকিয়ে রাখে। এমন পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলে।
গবেষণামূলক প্ল্যাটফর্ম দ্য কনভারসেশনের বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন,নাইট্রোজেনের ব্যবহার সামান্য কমলেও ফলনে তুলনামূলকভাবে বড় ধরনের পতন ঘটতে পারে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে কয়েক মিলিয়ন টন ফসল উৎপাদন কমে যাবে।
খাদ্য ও খুচরা বাজারে প্রভাব
ফসল উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়বে। আলু, রুটি, পাস্তা, ভুট্টা সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে। পশুখাদ্যের খরচও বেড়ে যাবে, যা প্রাণিসম্পদ খাতকে প্রভাবিত করবে। বায়োফুয়েল ও অন্যান্য কৃষি-শিল্পেও প্রভাব পড়বে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, হরমুজ প্রণালির দীর্ঘমেয়াদি বন্ধের প্রভাব রাতারাতি বোঝা যায় না। তেলের মতো বাজারদর দ্রুত ওঠানামা করে, কিন্তু ফসলের উৎপাদনের প্রভাব কয়েক মাস পরে প্রকাশ পায়।
বৈশ্বিক ঝুঁকির নতুন পরিমাপ
এই সংকট প্রমাণ করে, আন্তর্জাতিক কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা সরবরাহ চেইন কতটা সংবেদনশীল। হরমুজ প্রণালির মতো ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে অস্থিরতা বৈশ্বিক জীবনযাত্রার খরচ ও নিরাপত্তার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
বিশ্ব বাজারে সারের দামের ওঠানামা ও সরবরাহ বিঘ্নের কারণে চাষি, খাদ্য উৎপাদনকারী ও রাষ্ট্রসমূহকে নতুন নীতি ও প্রস্তুতি নিতে হবে। আন্তর্জাতিক সমন্বয়, বিকল্প সরবরাহ চেইন ও কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার এই ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।



