বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬
নারী

যে শাড়ি বুনেছেন সারা জীবন, সেই জামদানিই প্রথমবার পরলেন মাসুদা

prothomalo-bangla_2026-03-02_upn5kbwd_C3

রূপগঞ্জের রূপসী গ্রামের এক সাধারণ নারী মাসুদার জীবনের গল্প যেন জামদানি শাড়ির মতোই সূক্ষ্ম আর আবেগে ভরা। প্রায় ১১ বছর ধরে স্বামী ও সন্তানদের সঙ্গে তিনি জামদানি শাড়ি বুনেছেন। নিজের হাতের নিখুঁত কারুকাজে তৈরি অসংখ্য শাড়ি দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি হয়েছে। কিন্তু জীবনের প্রায় ৬০ বছর পার হলেও নিজের তৈরি একটি জামদানি শাড়ি পরার সুযোগ তাঁর হয়নি। সংসারের অভাব-অনটনের কারণে তৈরি করা প্রতিটি শাড়িই বিক্রি করে দিতে হতো।

জামদানি শাড়ি বাঙালির ঐতিহ্যের প্রতীক। সূক্ষ্ম নকশা, মসৃণ বুনন এবং নান্দনিক সৌন্দর্যের জন্য এই শাড়ির কদর সবসময়ই বেশি। সূতার মান ও কাজের সূক্ষ্মতার ওপর নির্ভর করে একটি জামদানি শাড়ির দাম সাধারণত তিন হাজার টাকা থেকে এক লাখ বিশ হাজার টাকা কিংবা তারও বেশি হতে পারে। যেহেতু এসব শাড়ি হাতে বোনা হয়, তাই এতে সময় ও শ্রমও অনেক বেশি লাগে। ফলে এর সৌন্দর্য এবং মূল্য—দুটিই আলাদা।

তবে সময়ের সঙ্গে মাসুদার জীবনের গল্পেও এসেছে পরিবর্তন। এখন তাঁর চার ছেলে জামদানি বুনে সংসারের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। তাঁদের মধ্যেই একজন, ইয়াকুব প্রধান, মায়ের জন্য এক বিশেষ চমক রাখেন। তিনি মাকে প্রথমবারের মতো একটি দামি জামদানি শাড়ি উপহার দেন। প্রায় ৬০ বছরের জীবনে এই প্রথমবার মাসুদা নিজের জন্য একটি জামদানি শাড়ি পরার সুযোগ পান।

শুধু তাই নয়, সেই শাড়ি পরেই মাসুদা উদ্বোধন করেন ছেলে ইয়াকুবের নতুন শোরুম ‘ইয়াকুব জামদানী হাউজ’। নিজের বাড়িতেই এই শোরুম গড়ে তুলেছেন ইয়াকুব। মায়ের মুখে হাসি ফোটানো আর বাবা-মাকে ভালো রাখা—এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় ইচ্ছা।

ছেলেদের দেওয়া শাড়ি পরে কেমন লাগছে—এমন প্রশ্নে আবেগভরা কণ্ঠে মাসুদা বলেন, তিনি খুব খুশি। শাড়িটি তাঁর খুব পছন্দ হয়েছে। এত যত্ন করে রাখবেন যে সহজে পরবেন না। তিনি বলেন,‘অনেক খুশি হইছি। অনেক আনন্দ লাগছে। খুব পছন্দ হইছে। এই শাড়ি আলগা (খুব যত্ন করে) করে পরন লাগব। এই শাড়ি পইরা পুলাপান কুলে নেওন যাইব না। পানিও লাগান যাইব না। আলমারিতে তুইল্যা রাখমু। আবার কোনো বড় অনুষ্ঠান হইলে পরমু।’

ইয়াকুব জানান, জামদানি শাড়ি বিক্রি করেই তিনি ঢাকায় নিয়ে গিয়ে মায়ের ব্রেন টিউমারের অস্ত্রোপচার করাতে পেরেছেন। আগে তিনি পাইকারিভাবে জামদানি শাড়ি বিক্রি করতেন। তবে গত দুই বছর ধরে অনলাইনে বিক্রি শুরু করেছেন। ফেসবুকে তাঁর পেজে ভালো সাড়া পাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।

মাসুদার জীবনের এই ছোট্ট আনন্দের মুহূর্ত যেন শুধু একটি শাড়ি পাওয়ার গল্প নয়—এটি একজন মায়ের দীর্ঘ ত্যাগের প্রতিদান, সন্তানের ভালোবাসা আর সংগ্রামের এক অনন্য উদাহরণ।

ইয়াকুব জামদানী হাউজজামদানিনারায়ণগঞ্জমাসুদাশাড়ি