বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬
বিশ্লেষণ

তীব্র গ্যাস সংকটের শঙ্কা

তীব্র গ্যাস সংকটের শঙ্কা

মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-ইরান সংঘাত তীব্র হওয়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও রান্নার গ্যাস (এলপিজি) আমদানিতে বিঘ্ন ঘটলে দেশে গ্যাস সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানার কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

জানুয়ারি থেকে এলপিজি বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। ফেব্রুয়ারিতে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দামে সিলিন্ডার বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও এখনো প্রতি সিলিন্ডারে ৪০০-৫০০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এলপিজি বাজার আবারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।

এলএনজি সরবরাহে সর্বোচ্চ উদ্বেগ
দেশে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ২৬০-২৭০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে প্রায় ৯৫ কোটি ঘনফুট আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে অর্থাৎ মোট সরবরাহের এক-তৃতীয়াংশের বেশি আমদানিনির্ভর। পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায়, বছরে প্রায় ৬০ লাখ টন এলএনজি আমদানি করা হয় ১১৫টি কার্গোর মাধ্যমে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় বড় অংশ আসে কাতার ও ওমান থেকে, পাশাপাশি স্পট মার্কেট থেকেও কেনা হয়।

মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে এলএনজি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। মার্চে ১১টি কার্গো আসার কথা রয়েছে যার বেশির ভাগ ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে এসেছে। তবে কোনো একটি কার্গো বিলম্বিত বা বাতিল হলে সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে গ্যাসের স্বল্পচাপ রয়েছে।

Advertisements

গত বছর এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় আরও বাড়বে যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে।

এলপিজি বাজারে নৈরাজ্যের আশঙ্কা
দেশে বছরে প্রায় ১৮ লাখ টন এলপিজি আমদানি করে বেসরকারি কোম্পানিগুলো। আমদানি কমলেই বাজারে সংকট তৈরি হয়। গত নভেম্বরে আমদানি ৪৪ শতাংশ কমে যাওয়ায় জানুয়ারিতে তীব্র সংকট দেখা দেয়। পরে আমদানি বাড়ানো হলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজি এলপিজির দাম ১৫ টাকা কমিয়ে এক হাজার ৩৪১ টাকা নির্ধারণ করে। কিন্তু বাজারে বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৬০০ থেকে এক হাজার ৮৫০ টাকায়। সংকট বাড়লে দাম আরও নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের উপাচার্য ড. এম তামিম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আমদানিনির্ভর দেশের জন্য অশনিসংকেত। তেল, এলএনজি ও এলপিজির দাম দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সরকারের অবস্থান
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সরকার বলছে, দেশে ৩০ দিনের জ্বালানি মজুত রয়েছে। বিকল্প নৌপথ ব্যবহার করে অবশিষ্ট এলএনজি কার্গো পৌঁছানোর আশা করা হচ্ছে। মার্চে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাব সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে না পড়ে। অর্থাৎ ডিজেলের দাম আগের মতোই ১০০ টাকা লিটার, অকটেন ১২০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা থাকবে। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে এক দিনে ক্রুড অয়েলের দাম ১০ শতাংশ বেড়েছে।

জ্বালানি তেলের মজুত
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা যায়, দেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে, যার বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়। সরকার জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ২৮ লাখ ২০ হাজার টন তেল আমদানির কার্যাদেশ অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে ২৪ লাখ ২০ হাজার টন উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এবং ১৪ লাখ টন সরকার-টু-সরকার চুক্তিতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি হওয়ার কথা।

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের সংরক্ষণ সক্ষমতা ৩৬ দিনের হলেও বর্তমানে মজুত রয়েছে মাত্র ১৫ থেকে ৩০ দিনের জ্বালানি তেল। ডিজেল মজুত আছে ১২ দিনের, পেট্রোল ১৯ দিনের, অকটেন ২৯ দিনের, জেড ফুয়েল ১৫ দিনের এবং ফার্নেস অয়েল ৯০ দিনের। সমুদ্রপথে আরও ১৫-২০ দিনের জ্বালানি তেল আমদানি হচ্ছে। এর মধ্যে রোববার ৩৫ হাজার টন ডিজেল নিয়ে ‘এমটি টরম এগনেস’ নামে একটি জাহাজ বহির্নোঙরে ভিড়ছে। এ ছাড়া আজ সোম ও বুধবার আরও দুটি জাহাজে ৩০ থেকে ৩২ হাজার টন ডিজেল আসার কথা রয়েছে। আগামীকালের মধ্যে সৌদি আরবের নুরা বন্দর থেকে একটি এবং ২১ মার্চ দেশটির জাপাননারা এলাকা থেকে অপরিশোধিত তেলবাহী আরেকটি জাহাজ রওনা হওয়ার কথা। বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব চালান সময়মতো পৌঁছাবে কিনা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

Advertisements
গ্যাস বিস্ফোরণজ্বালানিজ্বালানি সংকটযুদ্ধ