বকেয়া ও জ্বালানি–সংকটে লোডশেডিংয়ের শঙ্কা

সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাওনা জমে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে তেলচালিত বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর বকেয়া প্রায় ১৪ হাজার কোটি। ভারতের আদানির পর এখন দেশীয় বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকেরাও বকেয়া আদায়ে চাপ দিচ্ছেন। তাদের বক্তব্য, পাওনা না পেলে জ্বালানি কিনে উৎপাদন চালানো সম্ভব নয়। ফলে আসন্ন গ্রীষ্মে লোডশেডিং বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, শীতের শেষে ফেব্রুয়ারিতেই বিদ্যুতের চাহিদা ১২ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। গ্রীষ্মে তা সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। দেশে মোট উৎপাদন–সক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াট হলেও গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস তেলের ঘাটতিতে পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী সরকারি-বেসরকারি সব কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনে নেয় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। সংস্থাটি প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ প্রায় পাঁচ টাকা লোকসানে বিক্রি করে এবং সরকারের ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল। তবে যৌথ মালিকানাধীন ও ভারতীয় কেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয় ভর্তুকি দেয় না। এতে প্রতিবছর পিডিবির ঘাটতি বাড়ছে আর সময়মতো বিল পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছে তারা।
পিডিবির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্তে ঘাটতি মেটানো কঠিন হচ্ছে। দ্রুত সমাধান না হলে গ্রীষ্মে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে না।
বকেয়ার চাপে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন–সক্ষমতা বর্তমানে সাড়ে সাত হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এপ্রিলে ৭ হাজার ১০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কয়লা আমদানিতে অর্থসংকট বড় বাধা।
কয়লাভিত্তিক উৎপাদনের বড় অংশ আসে পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে, যার ক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। কেন্দ্রটির বকেয়া ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। একইভাবে রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র, বাঁশখালী তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র ও বরিশালের কেন্দ্রগুলোও বকেয়ার চাপে রয়েছে।
আদানির কেন্দ্র থেকে ১ হাজার ৪৩৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের হিসাব ধরা হলেও চুক্তি সংশোধন ও প্রায় ৬০ কোটি ডলার বকেয়া নিয়ে বিরোধ চলছে। এর মধ্যে ৩০ কোটি ডলার পরিশোধে তাগাদা দেওয়া হয়েছে। সরবরাহ ব্যাহত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।
তেলচালিত কেন্দ্রে জরিমানা বিতর্ক
ফার্নেস তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ৫ হাজার ৬৩৪ মেগাওয়াট। গ্যাস ঘাটতি বাড়লে এসব কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়বে। কিন্তু আউটেজ হিসাব ও জরিমানা নিয়ে বিরোধ দেখা দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে মালিকেরা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-এ অভিযোগ করেছেন। কমিশন সাময়িকভাবে জরিমানা আদায় স্থগিত করেছে।
বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন–এর সাবেক সভাপতি ইমরান করিম বলেন, বকেয়া শোধ না হলে জ্বালানি কেনা কঠিন হবে।
গ্যাসের ঘাটতি বড় ঝুঁকি
পিডিবির হিসাবে, গ্রীষ্মে লোডশেডিংমুক্ত সরবরাহের জন্য দিনে ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দরকার। কিন্তু পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, ১১০ কোটি ঘনফুটের বেশি আমদানির সক্ষমতা নেই। উৎপাদন কমছে, আর তাদের নিজস্ব দেনা ২২ হাজার ৮৩৮ কোটি টাকা। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর গ্যাস বিল বকেয়া ১৬ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা।
গ্যাস সরবরাহ ১১০ কোটি ঘনফুট হলে ৫৩৪ মেগাওয়াট, ১০০ হলে ১ হাজার ১০৪, ৯০ হলে ১ হাজার ৬৭৪ এবং ৮০ কোটি ঘনফুটে নামলে ২ হাজার ২৪৪ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হতে পারে। এতে প্রতিদিন তিন ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার আশঙ্কা রয়েছে।
সামনে কঠিন গ্রীষ্ম
মার্চে সর্বোচ্চ চাহিদা ১৬ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং গ্রীষ্মে ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। গ্যাসভিত্তিক ১২ হাজার ২০৪ মেগাওয়াট সক্ষমতার অর্ধেকের বেশি অলস বসে থাকতে পারে জ্বালানি সংকটে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিমের মতে, গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কয়লা ও তেলভিত্তিক উৎপাদন বাড়াতে হবে। তবে তাপমাত্রা বেশি হলে লোডশেডিং এড়ানো কঠিন হবে।
সব মিলিয়ে বকেয়া, জ্বালানি ঘাটতি ও নীতিগত অনিশ্চয়তা—এই তিন চাপে এবার গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ সরবরাহ বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।



