বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬
বিশ্লেষণ

পুলিশ কি ইচ্ছামতো তল্লাশি বা মারধর করতে পারে?

পুলিশ কি ইচ্ছামতো তল্লাশি বা মারধর করতে পারে?

মাদক নির্মূল করা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেকোনো দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্বাভাবিক দায়িত্ব। নাগরিকদের একটি নিরাপদ ও মাদকমুক্ত সমাজ দেওয়ার জন্য পুলিশ অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাবে—এটাই মানুষের প্রত্যাশা। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় অভিযানের ধরন ও পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সম্প্রতি ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের মারধরের অভিযোগ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে—পুলিশের ক্ষমতার সীমা কোথায়, আর নাগরিকের অধিকার কতটা সুরক্ষিত।

বাংলাদেশে নাগরিক তল্লাশি, গ্রেপ্তার এবং বলপ্রয়োগের বিষয়গুলো মূলত ফৌজদারি কার্যবিধি (Code of Criminal Procedure, 1898), পুলিশ রেগুলেশনস বেঙ্গল (Police Regulations Bengal, 1943), নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ এবং সংবিধানের বিভিন্ন ধারায় নির্ধারিত। এসব আইনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা দেওয়া হলেও তার ব্যবহার নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

তল্লাশির আইনি ক্ষমতা সাধারণত সাব-ইন্সপেক্টর বা তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের থাকে। কনস্টেবলরা একা তল্লাশি চালাতে পারেন না; তারা কেবল দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নির্দেশনায় সহায়তা করতে পারেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ৯৪ ও ৯৬ ধারা অনুযায়ী কোনো নির্দিষ্ট দলিল, বস্তু বা আলামত উদ্ধারের জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি বা সার্চ ওয়ারেন্ট নিয়ে পুলিশ তল্লাশি করতে পারে।

একই আইনের ১০২ ও ১০৩ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো বদ্ধ স্থান—যেমন বাসা, ঘর, ট্রাঙ্ক বা ব্যাগ—তল্লাশির সময় এলাকার অন্তত দুইজন সম্মানিত ব্যক্তিকে সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত রাখতে হবে। এতে তল্লাশির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

Advertisements

তবে সব সময় ওয়ারেন্টের অপেক্ষা করা সম্ভব নাও হতে পারে। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৫ ধারা অনুযায়ী, কোনো পুলিশ কর্মকর্তা যদি মনে করেন যে বিলম্ব হলে অপরাধের প্রমাণ নষ্ট হয়ে যেতে পারে, তবে তিনি কারণ লিখিতভাবে উল্লেখ করে ওয়ারেন্ট ছাড়াও তল্লাশি করতে পারেন। পরে সেই কারণ দ্রুত ম্যাজিস্ট্রেটকে জানাতে হয়।

দেহ তল্লাশির ক্ষেত্রেও আইন নির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৫১ ধারা অনুযায়ী কাউকে গ্রেপ্তার বা আটক করা হলে পুলিশ তার দেহ তল্লাশি করতে পারে। সে ক্ষেত্রে পোশাক ছাড়া অন্যান্য মালামাল জব্দ করা হলে তার একটি তালিকা তৈরি করতে হবে এবং সেই তালিকার কপি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দিতে হবে।

নারীর দেহ তল্লাশির ক্ষেত্রে আরও কঠোর নিয়ম আছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৫২ ধারা বলছে, কোনো নারীকে তল্লাশি করতে হলে তা অবশ্যই একজন নারী সদস্যের মাধ্যমে করতে হবে এবং তার শালীনতা রক্ষা করতে হবে। কোনো পুরুষ পুলিশ সদস্য সরাসরি কোনো নারীর দেহ তল্লাশি করতে পারেন না।

তল্লাশির সময় নাগরিকেরও কিছু অধিকার রয়েছে। কেউ চাইলে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যের পরিচয় জানতে পারেন। বিশেষ করে সিভিল পোশাকে থাকলে পুলিশকে পরিচয়পত্র দেখাতে হয়। তল্লাশির সময় নিরপেক্ষ বা পরিচিত কাউকে উপস্থিত রাখার অনুরোধও করা যেতে পারে। আবার তল্লাশির সময় যদি কোনো জিনিস জব্দ করা হয়—যেমন মোবাইল ফোন, ব্যাগ বা টাকা—তাহলে জব্দ তালিকার একটি কপি নেওয়া নাগরিকের অধিকার।

শারীরিক নির্যাতন বা মারধরের বিষয়ে আইন আরও স্পষ্ট। বাংলাদেশের কোনো আইনেই সন্দেহভাজন বা আটক ব্যক্তিকে মারধর করার অনুমতি নেই। কাউকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া যেতে পারে কিন্তু জনসমক্ষে লাঞ্ছনা করা বা শারীরিক আঘাত করা পুলিশের আচরণবিধির পরিপন্থী।

এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইন হলো নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩। এই আইনে বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মকর্তা যদি কাউকে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করেন, তা দণ্ডনীয় অপরাধ। নির্যাতনের ফলে মৃত্যু হলে অভিযুক্ত কর্মকর্তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং জরিমানার বিধান রয়েছে। আর আহত হলে অন্তত পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান আছে।

ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৬ থেকে ৫৩ ধারায় গ্রেপ্তার এবং বলপ্রয়োগের সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে গেলে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু শক্তি প্রয়োগ করা যাবে। কেউ পালানোর চেষ্টা করলে তাকে আটকাতে সীমিত বলপ্রয়োগ করা যেতে পারে। কিন্তু ব্যক্তি নিয়ন্ত্রণে চলে আসার পর তাকে মারধর করা সম্পূর্ণ বেআইনি।

অন্যদিকে, ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা অনুযায়ী পুলিশ ওয়ারেন্ট ছাড়াই কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে যদি তার বিরুদ্ধে যৌক্তিক সন্দেহ থাকে যে তিনি অপরাধ করেছেন বা করতে যাচ্ছেন। তবে এই ক্ষমতা ব্যবহারেও যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকা জরুরি।

পুলিশ রেগুলেশনস বেঙ্গল, ১৯৪৩-তেও পরিষ্কারভাবে বলা আছে—স্বীকারোক্তি আদায় বা তথ্য বের করার জন্য কোনো ব্যক্তির ওপর শারীরিক বা মানসিক চাপ প্রয়োগ করা যাবে না। আইন অনুযায়ী পুলিশের দায়িত্ব হলো তদন্ত করা, নির্যাতন করা নয়।

জনসমাগম বা দাঙ্গা পরিস্থিতিতে জননিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হলে পুলিশ লাঠিচার্জ বা বলপ্রয়োগ করতে পারে। তবে তা পরিস্থিতির প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত হতে হবে। অন্যথায় সেটি ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

বাংলাদেশের সংবিধানও নাগরিককে নির্যাতনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিয়েছে। সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাবে না এবং তার সঙ্গে নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর আচরণ করা যাবে না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ক্ষেত্রেও এই বিধান সমানভাবে প্রযোজ্য।

যদি কেউ পুলিশি নির্যাতনের শিকার হন, তবে তার আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩–এর ৫ ধারা অনুযায়ী ভুক্তভোগী অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। এমনকি প্রত্যক্ষ সাক্ষী না থাকলেও ভুক্তভোগীর জবানবন্দি এই আইনে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তবে একই আইনে মিথ্যা বা প্রতিহিংসামূলক অভিযোগের বিরুদ্ধেও শাস্তির বিধান রয়েছে। অর্থাৎ আইন একদিকে নাগরিকের অধিকার রক্ষা করতে চায়, অন্যদিকে আইনের অপব্যবহার ঠেকাতেও ব্যবস্থা রেখেছে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশে পুলিশ নাগরিককে তল্লাশি, আটক বা গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা রাখলেও তা নির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ। যুক্তিসঙ্গত কারণ, নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া এবং মানবাধিকার রক্ষার বাধ্যবাধকতা—এই তিনটি বিষয়ই আইনের মূল ভিত্তি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নাগরিকের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষাও সমান জরুরি।

Advertisements
পুলিশ