একটি নারীবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের প্রত্যাশা

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর একটি নির্বিঘ্ন ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে নতুন সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতিতে এই নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। জনগণের এই বিশাল জয় যেমন আনন্দের, তেমনি এটি নতুন সরকারের ওপর এক বিশাল দায়িত্বের পাহাড়ও চাপিয়ে দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী ও মানবাধিকারকর্মী খুশি কবিরের একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের প্রধান প্রত্যাশা—নতুন সরকার যেন প্রকৃত অর্থেই একটি নারীবান্ধব, বৈষম্যহীন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনে মনোনিবেশ করে।’
ভোটের ফলাফল ও রাজনৈতিক বার্তা
নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভোটারদের একটি বড় অংশই কোনো ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে রাষ্ট্র পরিচালনায় দেখতে চায় না। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা ৩০ লাখ শহীদের রক্ত আর দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের প্রত্যাখ্যান করার একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এই নির্বাচনে দৃশ্যমান।
খুশি কবিরের মতে, বিএনপিকে মনে রাখতে হবে যে বিএনপি সবার ভোট না পেলেও তারা এখন সবার সরকার। তাই প্রতিটি নাগরিককে সমান চোখে দেখা এবং স্বাধীনতার চার মূলনীতিকে সমুন্নত রাখাই হবে তাদের প্রথম কাজ।
আমাদের দেশে এখনো নারীদের মূলধারায় নিয়ে আসার পরিবর্তে পিছিয়ে রাখার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে যারা জাতিগত সংখ্যালঘু বা প্রান্তিক স্তরে বসবাস করেন, তাদের বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়।
খুশি কবির নতুন সরকারের কাছে আহ্বান জানানযেন প্রশাসন থেকে শুরু করে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়—সর্বক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়।নারী অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সনদগুলোর (যেমন: CEDAW) পূর্ণ বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অবসান করতে হবে। দেশ যেন কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর না হয়ে সবার জন্য হয়। ধর্মভিত্তিক অবস্থান যেন রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রভাব ফেলতে না পারে।
জবাবদিহিতা ও সংসদের বাইরের কণ্ঠস্বর
গণতন্ত্রের প্রাণ হলো জবাবদিহিতা। ভোট দেওয়ার মাধ্যমেই জনগণের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। জনগণের কাছে জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহি করার স্থায়ী ব্যবস্থা থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন,বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ যেন কেবল শহরকেন্দ্রিক না হয়ে গ্রাম, আদিবাসী, ভূমিহীন এবং ক্ষেতমজুরদের জীবনকেও স্পর্শ করে।
যারা পার্লামেন্টের বাইরে থাকবেন, তাদের মতামত নেওয়ার জন্যও একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি বের করা উচিত। নাগরিক সমাজের বক্তব্য শোনার মানসিকতা সরকারের থাকতে হবে।
২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ও তারুণ্যের শক্তি
বর্তমান সরকার গঠনের প্রেক্ষাপটে রয়েছে ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান। এই অভ্যুত্থানের মূল শক্তি ছিল তরুণ প্রজন্ম। আমাদের জনসংখ্যার এই বিশাল অংশটির চিন্তা, মেধা ও অবস্থানকে রাষ্ট্র গঠনে কাজে লাগাতে হবে। অভিজ্ঞদের পরামর্শ এবং তরুণদের উদ্যম—এই দুয়ের সংমিশ্রণে একটি আধুনিক বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।
ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ ও স্বৈরতন্ত্র রোধ
ক্ষমতা যেন কোনোভাবেই দেশকে কুক্ষিগত না করতে পারে এবং দেশ যেন পুনরায় স্বৈরতন্ত্রের দিকে ধাবিত না হয়, সেদিকে কঠোর নজর রাখা প্রয়োজন। ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে অনেক প্রশ্ন ও অস্পষ্টতা রয়েছে। ক্ষমতা কাঠামোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এই সনদের বিষয়গুলো আরও সহজ ও সুস্পষ্ট করা প্রয়োজন।সব বিষয়ে সবাই একমত না-ও হতে পারেন, কিন্তু স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকলে যেকোনো জটিলতা নিরসন সম্ভব।
বর্তমানে সবাই একটি সুন্দর, নিরাপদ এবং বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে। মানবাধিকার রক্ষা এবং নারী ও প্রান্তিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা নতুন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে আমরা নতুন সরকারকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত, যদি তারা সবার মতামত নিয়ে দেশ পরিচালনা করার মানসিকতা দেখায়।
সকলের প্রত্যাশা এই সরকার হবে জনগণের সরকার, তারুণ্যের সরকার এবং সর্বোপরি একটি নারীবান্ধব সরকার।



