ঘরের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন জীবন: গ্রামীণ নারীদের হাতে তৈরি জুতা যাচ্ছে বিদেশে

সকালে সংসারের কাজ সেরে কাজে বের হন তারা। কেউ সন্তানের হাত ধরে স্কুলে দিয়ে আসেন, কেউ বৃদ্ধ শাশুড়ির ওষুধ গুছিয়ে রাখেন। এরপর গ্রামেরই একটি কারখানায় গিয়ে শুরু হয় আরেক দায়িত্ব—জুতা তৈরি। রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ঘনিরামপুর গ্রামের এসব নারীর হাতে তৈরি জুতা এখন পৌঁছে যাচ্ছে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের বাজারে।
ঘনিরামপুরে অবস্থিত ব্লিং লেদার প্রোডাক্টস লিমিটেড নামের রপ্তানিমুখী জুতা কারখানায় বর্তমানে প্রায় তিন হাজার শ্রমিক কাজ করছেন। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই নারী। একসময় যাদের অনেকেই ঘরের বাইরে কাজ করার সুযোগ পাননি, আজ তারাই নিয়মিত আয় করছেন, নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিচ্ছেন।
কারখানায় কর্মরত নারীরা জানান, আগে সংসারের সব খরচের জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন মাস শেষে নিজের উপার্জনের টাকা হাতে পাওয়ার অনুভূতি আলাদা। একজন নারী শ্রমিক বলেন, ‘নিজের টাকায় সন্তানের খাতা-কলম কিনতে পারি—এটাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ।’
আরেক কর্মী জানান, আগে কাজের খোঁজে ঢাকায় যেতে হয়েছিল। পরিবার, সন্তান—সবকিছু ছেড়ে থাকতে হতো। এখন গ্রামেই কাজ করছেন। পরিবারকে সময় দিতে পারছেন, আবার আয়ও হচ্ছে। এতে মানসিক শান্তি বেড়েছে।
এই কারখানায় তৈরি জুতা পোল্যান্ড, তুরস্ক, জার্মানি, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মতো বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রামীণ নারীদের হাতে তৈরি পণ্য জায়গা করে নেওয়াকে নিজেদের সক্ষমতার স্বীকৃতি হিসেবেই দেখছেন তারা।
কারখানা কর্তৃপক্ষ জানায়, নারী শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে। কাজ শুরুর আগে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, রয়েছে মাতৃত্বকালীন ছুটি ও চিকিৎসা সুবিধা। এতে নারীরা নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারছেন।
রপ্তানিতে সাফল্যের জন্য প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ সালে রূপালী ব্যাংকের সর্বোচ্চ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের পুরস্কার পেয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, ভবিষ্যতে আরও বেশি নারীকে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
গ্রামের নারীদের এই এগিয়ে চলা শুধু অর্থনৈতিক পরিবর্তন নয়, এটি আত্মবিশ্বাস, মর্যাদা আর নিজের পরিচয় গড়ে তোলার গল্পও।



