মাতৃভাষার মর্যাদা: আমাদের দায়, আমাদের ভবিষ্যৎ

ভাষা কেবল যোগাযোগের উপকরণ নয়—এটি একটি জাতির স্মৃতি, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের ধারক। প্রযুক্তির অগ্রগতিতে যোগাযোগের মাধ্যম বদলালেও ভাষার প্রয়োজনীয়তা কমেনি; বরং ভাষার সঠিক চর্চাই একটি জাতিকে বিকশিত ও সমৃদ্ধ করে। পৃথিবীর ইতিহাসে বহু ভাষা হারিয়ে গেছে মানুষের প্রয়োজন মেটাতে না পারার কারণে। সংখ্যার বিচারে বাংলা আজ বিশ্বের চতুর্থ বৃহৎ ভাষা হলেও কেবল সংখ্যাই মর্যাদার মানদণ্ড হতে পারে না—বিশ্বায়নের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও জীবনবোধে ভাষার শক্ত অবস্থান জরুরি।
বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় আমাদের ইতিহাস রক্তে লেখা। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বারের আত্মত্যাগ শুধু ভাষার অধিকার নয়, জাতিসত্তার ঘোষণাও ছিল। অথচ শহীদ মিনার নির্মাণে বাধা, ভাঙচুর কিংবা ভাষা শহীদদের স্মরণে শ্রদ্ধা জানানো নিয়ে বিতর্ক—এসব আমাদের সচেতনতার ঘাটতিই তুলে ধরে।
একই চিত্র দেখা গেছে ভারতের আসামের শীলচরে ১৯৬১ সালে, যেখানে বাংলা ভাষার দাবিতে ১১ জন প্রাণ দেন। ক্ষমতা ও সাম্রাজ্যবাদ বারবার ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আগ্রাসন চালিয়েছে—এটি ইতিহাসের নির্মম সত্য।
পাকিস্তানের সংবিধানে ১৯৫৬ সালে বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পেলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ ছিল সীমিত। এই ভাষা-সংগ্রামের ধারাবাহিকতাই ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার সশস্ত্র সংগ্রামে রূপ নেয়। অগণিত প্রাণ ও সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন রাষ্ট্রে বাংলা আজও অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত—এটি আমাদের জন্য লজ্জার।
চিকিৎসা, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, ব্যাংকিং কিংবা আইনি প্রক্রিয়ায় ইংরেজি ফরমের দৌরাত্ম্য আজও বহাল। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও অনুবাদশিল্প এগোয়নি; এমফিল-পিএইচডির সংখ্যা বাড়ছে, অথচ জ্ঞানচর্চায় বাংলার ব্যবহার কমছে। এমনকি বিয়ে-খতনার দাওয়াতপত্রেও বাংলা জায়গা হারাচ্ছে। পুঁজিবাদী অহমিকা ও ভ্রান্ত আধুনিকতার দোহাই দিয়ে পোশাক-আচরণে, ভাষাচর্চায় বাংলা সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছি আমরা।
শিশুদের বাংলা শেখার আগেই ইংরেজিমুখী করার প্রবণতা বাড়ছে, ফলে ভাষাগত শিকড় দুর্বল হচ্ছে।এর পরিণতি কি—তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ইংরেজিতে ন্যূনতম পাশ নম্বর না পাওয়ার ঘটনা। অথচ ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, চীনসহ বহু দেশ নিজেদের ভাষাকে আঁকড়ে ধরেই জ্ঞান-বিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে এগিয়েছে।
রাষ্ট্র যদি সবার জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, অথচ ইংরেজি ভার্সন শিক্ষাকে প্রাধান্য দেয়—তবে ভাষার ভবিষ্যৎ প্রশ্নের মুখে পড়ে। বাহ্যিক শত্রুর চেয়ে ভয়ংকর হয়ে ওঠে অপ্রকাশ্য ঘরের শত্রু; যারা অবহেলায়, অনুকরণে ও আত্মবিস্মৃতিতে ভাষাকে ক্ষয় করে।
মা, মাটি ও মাতৃভাষা—এই তিনটি একসূত্রে গাঁথা। বিশ্বায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে বাংলাকে বাদ দিয়ে নয়, বরং বাংলাকেই বিকশিত করে এগোতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগ, প্রয়োজন সচেতনতা ও দেশপ্রেম। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা মানেই নিজের ভবিষ্যৎ রক্ষা—এই বোধ জাগ্রত করাই আজ সময়ের দাবি।



