বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনরবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬
নারী

নারী, স্বাস্থ্য ও সাহস—মেহেরুন নেহার লিলির গল্প

ll-ap

দেশের একেবারে উত্তরের জনপদ তেঁতুলিয়া। সমতলের চা–বাগান, শীতল হাওয়া আর দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্যের আড়ালে এখানকার নারীদের জীবনযাত্রা সহজ নয়। প্রতিকূল আবহাওয়া, সীমিত যোগাযোগব্যবস্থা ও চিকিৎসাসেবার ঘাটতি—সব মিলিয়ে মাতৃত্ব এখানে বরাবরই ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক নারীদের জন্য নিরাপদ প্রসব বহুদিন ধরেই ছিল এক অদৃশ্য সংগ্রাম।

এই বাস্তবতার ভেতরেই একজন নারী নির্ভীকভাবে বদলে দিচ্ছেন সেই চিত্র। তিনি মেহেরুন নেহার লিলি—কাজীপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি)। তার হাত ধরে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৪২০ জন মা নিরাপদে সন্তান জন্ম দিয়েছেন। এই সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয় প্রতিটি জন্ম মানে একটি জীবন রক্ষা, একটি পরিবারের স্বস্তির নিঃশ্বাস।

২০১১ সালে কমিউনিটি ক্লিনিকে যোগ দেওয়ার সময় লিলির কাজ সীমাবদ্ধ ছিল প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায়। কিন্তু তিনি খুব দ্রুত বুঝতে পারেন—এই এলাকায় নারীদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নিরাপদ মাতৃত্বসেবা। সেই উপলব্ধি থেকেই ২০১৪ সালে তিনি কমিউনিটি স্কিল বার্থ অ্যাটেনডেন্ট (সিএসবিএ) প্রশিক্ষণ নেন। ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো স্বাভাবিক প্রসব করানোর অভিজ্ঞতা লিলির জীবনে গভীর ছাপ ফেলে। ভয়, দ্বিধা আর দায়িত্বের ভার—সবকিছুর মধ্যেও নবজাতকের কান্নার শব্দ তাকে বুঝিয়ে দেয় এই পথই তার জন্য নির্ধারিত।

তেঁতুলিয়ায় প্রসবকালীন ডাক মানেই সময়ের বাধ্যবাধকতা নেই। রাত–দিন, ঝড়–বৃষ্টি কিংবা কুয়াশাচ্ছন্ন শীত—সব পরিস্থিতিতেই লিলি পৌঁছে যান মায়েদের পাশে। স্বাভাবিক প্রসবের পাশাপাশি তিনি গর্ভকালীন পরীক্ষা, প্রসব–পরবর্তী পরিচর্যা, রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস পর্যবেক্ষণ, পরিবার পরিকল্পনা পরামর্শ এবং সরকারি ওষুধ সরবরাহের দায়িত্ব পালন করেন।

Advertisements

তিনি বলেন, ‘কোনো মা আর নবজাতককে নিরাপদে দেখে ফিরতে পারলেই মনে হয়, সব পরিশ্রম সার্থক।’

লিলির সেবার সবচেয়ে বড় সুফল পেয়েছে চা–শ্রমিক, দিনমজুর ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলো। যাদের পক্ষে শহরের হাসপাতালে যাওয়া কঠিন তাদের জন্য কমিউনিটি ক্লিনিকই হয়ে উঠেছে ভরসার জায়গা। তার নিরবচ্ছিন্ন সেবার কারণে এলাকায় মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

স্থানীয় নারীরা বলেন, ‘লিলি আপা থাকলে ভয় লাগে না।’ এই বিশ্বাসই প্রমাণ করে স্বাস্থ্যসেবা কেবল অবকাঠামো নয়—মানুষই সবচেয়ে বড় শক্তি।

তিন সন্তানের মা লিলি সংসার সামলেও পেশাগত দায়িত্বে কোনো ছাড় দেননি। স্বামী মকসেদ আলীর সহযোগিতা তাকে আরও দৃঢ় করেছে। তার মতে, লিলির কাজ কেবল একটি চাকরি নয়—এটি একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা।

নিরলস পরিশ্রমের স্বীকৃতি হিসেবে লিলি পেয়েছেন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ সিএইচসিপি সম্মাননা, রোকেয়া দিবসে জয়িতা পুরস্কার এবং রংপুর বিভাগীয় পর্যায়ে ‘অদম্য নারী’ সম্মাননা। তবে তার কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন প্রতিটি সুস্থ মা ও শিশু।

হিমালয়ের পাদদেশে সীমান্তঘেঁষা এক জনপদে মেহেরুন নেহার লিলির কাজ প্রমাণ করে নারীর ক্ষমতায়ন শুরু হয় নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিয়ে। প্রশিক্ষণ, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতা একত্র হলে একজন নারীই বদলে দিতে পারেন শত শত পরিবারের ভবিষ্যৎ।

লিলির গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নিরাপদ মাতৃত্ব বিলাসিতা নয়, এটি অধিকার। আর সেই অধিকার নিশ্চিত করতে কখনো কখনো একজন লিলিই যথেষ্ট।

Advertisements
নারী