বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬
নারী

বাবার স্মৃতিতে ১০০ দিনে ১০০ ম্যারাথন, ৪ হাজার ২০০ কিলোমিটার ছুটলেন এই নারী

f8c1dbe0-0103-11f1-8373-25a35d9e886f.png

শুরুটা ছিল বাবার স্মরণে নিজের শিকড়কে ছুঁয়ে দেখার এক ব্যক্তিগত যাত্রা। কিন্তু সেই যাত্রাই শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় এক অবিশ্বাস্য সহনশীলতার গল্পে। যুক্তরাজ্যের গ্রেটার ম্যানচেস্টারের বাসিন্দা হানা কক্স মাত্র ১০০ দিনে ১০০টি ম্যারাথন দৌড়ে দক্ষিণ এশিয়ার একাধিক দেশ অতিক্রম করে পাড়ি দিয়েছেন প্রায় ৪ হাজার ২০০ কিলোমিটার পথ।

৪১ বছর বয়সী হানা এই দৌড় শুরু করেন ভারতের ভেতর দিয়ে বিস্তৃত ঐতিহাসিক ‘ইনল্যান্ড কাস্টমস লাইন’ ধরে। ব্রিটিশ শাসনামলে পণ্য পরিবহন ও শুল্ক নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহৃত এই পথ ধরেই তিনি এগিয়ে গেছেন তার বাবার জন্মভূমির ইতিহাস অনুসরণ করতে।

হানার বাবা ডেরিক কক্স জন্মগ্রহণ করেছিলেন ভারতের কলকাতায়। পরে ১৯৫৩ সালে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান তিনি। ২০১১ সালে বাবার মৃত্যু হলে হানা অনুভব করেন নিজের পারিবারিক ইতিহাসের সঙ্গে নতুন করে সংযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। সেই ভাবনা থেকেই এই দীর্ঘ যাত্রার পরিকল্পনা।

শুরুতে পুরো পথ দৌড়ে নয়, গাড়িতে পাড়ি দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন হানা। কিন্তু ২০২৫ সালের মে মাসে যাত্রা শুরুর পর সিদ্ধান্ত বদলান তিনি। প্রতিদিন একটি করে ম্যারাথন দৌড়ানোর চ্যালেঞ্জ নেন এবং শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্তেই অটল থাকেন।

Advertisements

সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) তিনি তার দৌড় শেষ করেন। বিবিসি রেডিও ম্যানচেস্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হানা বলেন, এই অনুভূতিটা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আমি নিজেকে কখনো দৌড়বিদ ভাবিনি। যারা আমাকে চেনে, তাদের অনেকেই বিশ্বাস করতে পারবে না আমি এটা করেছি।

ভারতের ভেতর দিয়ে দৌড়ানোর অভিজ্ঞতাকে হানা বর্ণনা করেছেন অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হিসেবে। তার মতে, প্রতিদিন চারপাশের পরিবেশ নতুন করে নিজেকে মানিয়ে নিতে বাধ্য করেছে। রাস্তার অবস্থা, যানবাহনের চাপ, মানুষের ভিড় সব মিলিয়ে প্রতিটি দিন ছিল আলাদা এক অভিজ্ঞতা। এ সবকিছু মিলিয়ে ইন্দ্রিয়গুলোর ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ত। প্রতিটি মুহূর্তে সতর্ক থাকতে হতো।

তিনি জানান, শারীরিক দিক থেকেও এই যাত্রা ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। স্কোলিওসিস ও একটি অটোইমিউন রোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি দৌড় থামাননি। এক সপ্তাহ তীব্র গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিসে ভুগেও তাকে ম্যারাথন শেষ করতে হয়েছে। শেষ কয়েক দিন বাঁ পায়ে গুরুতর চোট নিয়ে দৌড়ান তিনি।

হানা বলেন, শেষ তিন দিন ছিল সবচেয়ে কঠিন। আমি হাসপাতালে যাব তবে আপাতত ভালো আছি। আজ আর দৌড়াতে হচ্ছে না এটা ভেবেই স্বস্তি পাচ্ছি।

এই দীর্ঘ যাত্রার শেষাংশে হানা বাংলাদেশ ভূখণ্ড অতিক্রম করে গন্তব্যে পৌঁছান। তার দাবি, ‘ইনল্যান্ড কাস্টমস লাইন’ ধরে পুরো পথ পাড়ি দেওয়া তিনিই প্রথম ব্যক্তি। বিষয়টি নিয়ে তিনি প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে গবেষণা করেছেন।

হানার পূর্বপুরুষেরা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ছিলেন এবং তাদের কেউ কেউ ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে কাজ করেছেন। সেই ইতিহাস অনুসরণ করতেই তার এই দৌড় যা তিনি নাম দিয়েছেন ‘প্রজেক্ট সল্ট রান’।

এই প্রকল্পের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংস্থার জন্য ৭৫ হাজার পাউন্ডের বেশি অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে।

হানার গল্প এখন শুধু বাবার স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত নয় বরং এটি মানবিক দৃঢ়তা, ইতিহাসের অনুসন্ধান এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

Advertisements
ম্যারাথন