বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬
এডিটরস পিক

ভাইকিংদের খাদ্যভ্যাস

IMG-20260114-WA0019

ভাইকিং শব্দটির সাথে অনেকেই পরিচিত। টেলিভিশন, রিলস বা ওয়েব সিরিজে অনেকেই হয়তোবা দেখেছেন ভাইকিং কাদের বলা হয়। মেডিভাল যুগ সময়কাল ৮০০ থেকে ১১০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নরডিক অঞ্চলে বসবাস করা মানুষদের ভাইকিং বলা হতো। তারা সামুদ্রিক জাতি ছিলো, উচা লম্বা ও অনেক শক্তিশালী এবং যুদ্ধে পারদর্শি পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনের  সবকিছুতে যাদের ছিল স্বকীয় দক্ষতা। তারা যেসব যায়গায় বসবাস করতো ঐ জায়গা গুলোতে ছিল কঠোর শীত, উচু পাহাড়, স্বল্প আবাদযোগ্য জমি এবং দীর্ঘ অন্ধকারময় বাদল তবুও তারা সেখানে বসবাস করতে সক্ষম ছিল। কারণ তাদের খাদ্যাভ্যাসও ছিল ঐরকম, যা তাদের এই রকম কঠিন যায়গায়ও টিকিয়ে রাখতো। 

স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় ছিলো ভাইকিং দের বসবাস যা এখন উত্তর ইউরোপীয় এর তিন দেশ নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্ক। বিশাল বরফেঢাকা উপকূল আর ধূসর আকাশনিয়ে গঠিত ছিল এই অঞ্চল, এই রকম পরিবেশে জন্ম নিয়েছিল এক যোদ্ধা জাতি ভাইকিং , যাদের নাম শুনলে আজও ইউরোপের বুকের ভেতর একটা গর্জন ওঠে । তারা মিডেভাল যুগে ইংল্যান্ডে ডাকাতি করতো যে জায়গায় তারা ডাকাতি করতো সেই যায়গায় কিছু ছেড়ে আসতো না শুধু তাই নয় তারা সমুদ্রযোদ্ধাও ছিল আবার জটিল সামাজিক কাঠামো, ব্যাপক বাণিজ্যিক যোগাযোগ আর অনন্য খাদ্যসংস্কৃতির মধ্যেও খুঁজে পাওয়া যায় ভাইকিং দের কথা। যে যুগে ইউরোপের দক্ষিণাংশে মসলা, রুটি এবং আঙুরের বিশেষ পানীয় সমৃদ্ধ টেবিল সাজাত, সেই সময়ে উত্তর সমুদ্রের মানুষের খাদ্যাভ্যাস গড়ে উঠেছিল ভিন্ন ভূপ্রকৃতি ও আবহাওয়ার দাবিতে। ভাইকিং দের সমৃদ্ধ খাদ্যাভ্যাসের কারণেও তাদের একটি বিশেষ পরিচিতি ছিল। 

নরডিক অঞ্চলে ভাইকিংরা শুধু যুদ্ধেই পারদর্শী ছিল না। দৈনন্দিন জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় কৃষিকাজ, পশুপালন, সংরক্ষণ, রান্না ও উৎসব—সবকিছুতেই তাদের ছিল আলাদা দক্ষতা। ভাইকিংদের জীবনযাত্রার নানান ডকুমেন্টারি থেকে জানা যায়, তারা ছিল যথেষ্ট পরিমিত ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাসের অনুসারী। আসুন জেনে নি তাদের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে।

খাবারে প্রকৃতি ও জলবায়ুর প্রভাব

স্ক্যান্ডিনেভিয়ার হিমেল প্রকৃতি ভাইকিংদের খাদ্যাভ্যাস গঠনে বড় ভূমিকা রেখেছে। দীর্ঘ শীত ও অল্প গ্রীষ্ম এবং কঠোর জলবায়ুর কারণে ফসল ফলানোর সময়কাল ছিল খুব কম তাদের কাছে। তাই তারা কৃষিকাজের পাশাপাশি শিকার, পশুপালন ও মাছ ধরাকে গুরুত্ব দিতেন বেশি। ভাইকিং আবাসস্থলের আশপাশে সাধারণত ভেড়া, গরু, ছাগল, শূকর, হাঁস-মুরগির ছোট খামার থাকত বলে জানা যায়। এবং বিভিন্ন ধরনের ধোঁয়া দিয়ে, শুকিয়ে, লবণ যুক্ত করে খাদ্য সংরক্ষণ করে রাখত। প্রতিবছরের শীতের আগে পরিবারগুলো মাংস জমিয়ে রাখত, যা ছিল তাদের টিকে থাকার প্রধান উপায়। তাদের খাবারের একটি বড় অংশ আসত তাজা মাছ, হাঙর, কড, স্যামন, হারিং, সি-ফুড প্রভৃতি সামুদ্র থেকে। 

ভাইকিং ডায়েটের প্রাণ

ভাইকিং দের খাদ্যাভ্যাসে প্রাণ ছিল সামুদ্রিক মাছ। স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় উপকূলের মাছ ছাড়া মানুষের পক্ষে জীবনধারণ করা অসম্ভব ছিল প্রায়। ভাইকিংরা ছিলেন দক্ষ শিকারি ও জেলে। সবচেয়ে জনপ্রিয় মাছ ছিল ভাইকিংদের কাছে স্যামন, কড, হারিং, ফ্ল্যাটফিশ ও ইল। এগুলো বহুদিন রাখার জন্য শুকানো ও লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা হতো, বিশেষ করে হারিং ছিল শীতকালীন খাবারের প্রধান উৎস সেখানে। আজও নরডিক অঞ্চলে এই ঐতিহ্য চলমান রয়েছে। এমনকি যোদ্ধারাও জাহাজে মাছ ধরে খেতেন এবং যাত্রাপথে শুকনো মাছ বহন করতেন। 

মাংস ও শিকার

যুদ্ধে পুষ্টির উৎস ছিল তাদের কাছে মাংস। মাংস ভাইকিংদের কাছে শুধু খাবার নয়, যারা নিরন্তর সমুদ্রযাত্রা ও যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতেন, তাদের জন্য একপ্রকার শক্তি ছিল মাংস। তাদের খাদ্যতালিকায় ছিল গরু, ভেড়া, ছাগল, শূকর, ঘোড়া, হরিণ, ভালুক, সিল, বুনো শূকরের মতো নানা বন্য প্রাণীর মাংস। শহর ও গ্রাম উভয় জায়গাতেই পশুপালন করা হতো। মাংস রান্নার পাশাপাশি ধোঁয়া ও লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা ছিল ব্যাপক প্রচলিত। শীতের সময় এসব খাবারই ছিল একমাত্র ভরসা। নর্স সাহিত্যকর্মগুলো থেকে দেখা যায় যুদ্ধ শেষে যোদ্ধারা আগুন জ্বালিয়ে মাংস রান্না করতো। আইসল্যান্ডিক সাগাতেও উল্লেখ আছে, বড় কাঠের হলে বসে মাংস কাটাকাটি, উদ্‌যাপন করা ছিল দৈনন্দিন রেওয়াজ। 

শাকসবজি, বুনো ফল ও দুগ্ধজাত খাবার

ভাইকিংরা মাংসাশী হলেও পাশাপাশি শাকসবজিও খেত অনেক। শালগম, গাজর, কপি, ধনে, রসুন, বিট, পার্সনিপ, শালগম আর পেঁয়াজ থকতো তাদের খাবারে ব্যাপক। বন্য ফল যেমন ব্লুবেরি, লিঙ্গনবেরি, ক্লাউডবেরি খাওয়ার চল ছিল। যেসব শাকসবজি কম সময়ে জন্মায় এবং সহজে সংরক্ষণ করা যায়, মূলত সেগুলোর ওপর নির্ভর করত ভাইকিংদের কৃষিজ পদ্ধতি। তাদের গৃহপালিত পশু ছিল প্রচুর। ফলে টক দই, মাখন, চিজ, হার্ড চিজ, বাটার, ছানার বিভিন্ন রূপ এবং বাটারমিল্কের মতো দুগ্ধজাত খাবারও ভীষণ জনপ্রিয় ছিল ভাইকিংদের কাছে। 

দৈনন্দিন পদ

খাদ্যশস্য, বিশেষ করে বার্লি, রাই ও ওটস থেকে তৈরি হতো রুটি। অনেক গবেষকরা এই রুটিকে ভাইকিং সংস্কৃতির সর্বজনীন খাদ্য বলে উল্লেখ করেন। ভাইকিংদের খাবারে রুটি আর পোরিজের উপস্থিতি ছিল নিয়মিত। পোরিজ ছিল সকালের প্রধান খাবার। স্বাদ বাড়ানোর জন্য যবের ময়দা, কখনো সামুদ্রিক লবণ, কখনো বন্য বেরির রস দেয়া হতো। তাদের রুটি অনেকটা আধুনিক রুটির মতোই হতো। 

ফ্রেয়া’স কিচেন

ভাইকিং গৃহস্থলির রান্নার দায়িত্ব নারীরা পালন করতেন সব। তাদের ভূমিকা ছিল ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ কারণ, খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বণ্টনে তাদের দক্ষতা ছিল টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি। ফ্রেয়া কিচেন বলার কারণ হলো  ফ্রেয়া হল প্রেম ও উর্বরতার দেবী ভাইকিং মিথলজিতে ফ্রেয়ার আসির্বাদ ও তার সঙ্গে প্রায়ই খাদ্য, বংশবৃদ্ধি, ভূমির উর্বরতার সম্পর্ক টানা হয়। স্ক্যান্ডিক কবিতায় রান্নাঘরকে বলা হয়েছে “ফ্রেয়া’স হার্থ” যা নারীদের সামাজিক গুরুত্বকে তুলে ধরে।

নর্স মধু ও পানীয়

ভাইকিংদের সবচেয়ে প্রিয় পানীয় ছিল মিদ, যা মধু থেকে তৈরি একধরনের কড়া পানীয়। ভাইকিং মিথলজিতে ‘থর’ তুফানের দেবতা এর সবচেয়ে প্রিয় পানীয় ছিল এই মিদ যার কারণে এই মিদ সবচেয়ে বেশি পান করতো ভাইকিংরা এমনকি যুদ্ধের আগে বা রেইডের আগেও তারা মিদ পান করে নিত এবং বিশ্বাস করত ‘থর’ শক্তি দিবে এই চিত্র খুব জনপ্রিয় টিভি সিরিজ ‘ভাইকিংস’-এ। পানীয় তালিকায় আরও ছিল আলে যা বার্লিতে তৈরি পানীয় বিশেষ এছাড়াও  বিয়ার, ফ্রুট ওয়াইন প্রভৃতি। 

ভাইকিং ভোজ

রাজা, ইয়ার্ল বা চিফটেনরা (যা তারা তাদের লিডারদের ডাতকো) বড় আয়োজন করতেন সাম্বল বা ব্লোটের সময়। সাম্বল ছিল পানীয়ভিত্তিক এক অনুষ্ঠান, যেখানে যোদ্ধারা শপথ নেত এবং কবিরা সাগা আবৃত্তি করতো আর দেবতাদের উদ্দেশে উৎসর্গ করা হতো বিশেষ পানীয়। ব্লোট ছিল তাদের ধর্মীয় উৎসর্গমূলক আয়োজন। এ সময়ে পশু উৎসর্গ করে সেটির মাংস ভোজে পরিবেশনের রেওয়াজ ছিল। ‘ভাইকিংস’ সিরিজে আপনি এসব দৃশ্যের একটি ধারণা নিতে পারেন, কেমন ছিল ভাইকিং ভোজ বা অনুষ্ঠানগুলো। 

বরফেঢাকা উত্তরের সেই দানবের মত যোদ্ধাদের জীবন আজ আমাদের কাছে বিস্ময় আর কৌতূহলে ভরা গল্প। ভাইকিংদের রান্নাঘর, হাঁড়ি বা শুকনো মাছের গল্প শুনলেই বুঝতে পারা যায়, তাদের জীবন কতটা সংগ্রামী ও বৈচিত্র্যময় ছিল। ভাইকিংদের খাদ্যসম্ভার শুধু পুষ্টির ব্যাপার নয়; ছিল বেঁচে থাকার শক্তি, সামাজিক শ্রেণি, ধর্মীয় বিশ্বাস, ভ্রমণ ও সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ।