হরেক রঙে সেজেছে পুরান ঢাকার আকাশ

বিকেল গড়াতেই পুরান ঢাকার আকাশটা বদলে যেতে শুরু করে। নীলের বুক চিরে একে একে ভেসে ওঠে রঙিন ঘুড়ি কোনটা পাখির মতো ডানা মেলে, কোনটা প্রজাপতির মতো হালকা, আবার কোনটা ঈগলের মতো দাপুটে। ছাদের পর ছাদ থেকে সুতো টানাটানিতে তৈরি হয় এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা। হঠাৎ কারও ঘুড়ি কেটে গেলেই চারপাশ থেকে ভেসে আসে উল্লাসের চিৎকার।
শুধু আকাশেই নয়, উৎসব নেমে আসে ঘরে ঘরেও। বিকেলের পরপরই বিভিন্ন বাড়ির ছাদে জোরে বাজতে থাকে গান, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসে পিঠার গন্ধ। পুরান ঢাকা যেন এক দিনের জন্য হয়ে ওঠে আনন্দের নগরী।
সাকরাইন ঘিরে এবার কিছুটা দুশ্চিন্তা থাকলেও গতকাল বুধবার পৌষসংক্রান্তির দিনে সেই শঙ্কাকে পেছনে ফেলে উৎসবে মেতে ওঠে মানুষ। লক্ষ্মীবাজার, নারিন্দা, ওয়ারী, সূত্রাপুর, শাঁখারীবাজার, বংশাল, শিংটোলা, নাজিরাবাজারসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে বিকেল হতেই আকাশ ভরে যায় নানা ধরনের ঘুড়িতে।
কয়েক দিন আগে সামাজিক মাধ্যমে কিছু এলাকায় সাকরাইন নিয়ে আপত্তির কথা শোনা গিয়েছিল। কোথাও কোথাও শব্দদূষণ ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আপত্তি তুলে লিফলেটও বিতরণ করা হয়। এতে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হলেও গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
পুরান ঢাকার জীবনে সাকরাইন কেবল একটি উৎসব নয়, এটা স্মৃতি আর ঐতিহ্যের অংশ। পৌষ মাস এলেই ঘুড়িকে ঘিরে এই আয়োজন শুরু হয়। অনেকের ধারণা, ‘সংক্রান্তি’ শব্দটাই সময়ের সঙ্গে বদলে ঢাকাইয়া উচ্চারণে ‘সাকরাইন’ হয়ে গেছে। উৎসবের অনেক আগেই অলিগলিতে জমে ওঠে ঘুড়ির দোকান, শুরু হয় মাঞ্জা দেওয়া আর প্রস্তুতির তোড়জোড়।
গতকাল সকাল থেকেই ছাদে ছাদে শুরু হয় ব্যস্ততা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আকাশে ঘুড়ির ভিড়ও বাড়তে থাকে। সন্ধ্যা নামতেই আলো আর রঙের ঝলকানিতে অন্যরকম চেহারা নেয় পুরান ঢাকা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবার ঘুড়ির বেচাকেনা ভালোই হয়েছে। শাঁখারীবাজারের এক বিক্রেতা জানান, পাখি, প্রজাপতি, ঈগল, টেক্কা, মালাদার, বাদুড় এমনকি কার্টুনের আদলে বানানো ঘুড়িও বেশ বিক্রি হয়েছে। বড় আকারের ঘুড়ির দিকেই ক্রেতাদের আগ্রহ ছিল বেশি।
সাভার থেকে আসা দুই ভাই হাসিব ও জাবের বলেন, “পুরান ঢাকার সাকরাইন না দেখলে আসলে উৎসবটা দেখা হয় না। প্রতি বছরই সময় বের করে চলে আসি।”
লক্ষ্মীবাজারের বাসিন্দা বীরেন দাস বললেন, “ছোটবেলা থেকে এই দিনটার জন্য অপেক্ষা করি। বন্ধুদের সঙ্গে ঘুড়ি, গান, আতশবাজি সব মিলিয়ে দিনটা অন্যরকম হয়ে যায়।”



