বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬
নারী

বিচ্ছেদ ও সমাজ: একা নারীর সাহসী লড়াই

Untitled-2

বিচ্ছেদ কি কেবল একটি সম্পর্কের সমাপ্তি, নাকি নারীর জীবনে আরেকটি কঠিন যুদ্ধের সূচনা? আমাদের সমাজে বিচ্ছেদকে এখনো বেশির ভাগ সময়ই ‘ব্যর্থতার গল্প’ হিসেবে দেখা হয়। সংসার ভাঙলেই প্রশ্ন ওঠে দোষ কার? আশ্চর্যজনকভাবে, অভিযোগের তীরটি প্রায় সব সময়ই গিয়ে ঠেকে নারীর দিকেই। একুশ শতকে দাঁড়িয়েও ‘একা পুরুষ’ আর ‘একা নারী’র সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার ফারাক এখনো বিশাল।

পরিসংখ্যান বলছে, বিষয়টি আর ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়—এটি এখন একটি সামাজিক বাস্তবতা। শুধু ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনেই ২০২৩ সালে ১২ হাজারের বেশি তালাক রেজিস্ট্রি হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০টি পরিবার ভেঙে গেছে। একই সময়ে ঢাকা দক্ষিণে এই সংখ্যা ছিল প্রায় আট হাজার। সব মিলিয়ে রাজধানীতে বছরে প্রায় ২০ হাজার পরিবার ভাঙছে—যা হাজারো স্বপ্নের অপমৃত্যুর দলিল।

গবেষণা ও বিভিন্ন মিডিয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, তালাকের সংখ্যা ও হারের দিক থেকে ঢাকা শীর্ষে থাকলেও ঢাকার বাইরের চিত্রও কম উদ্বেগজনক নয়। জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে চুয়াডাঙ্গায় ৮ হাজার ১০৬টি বিয়ের বিপরীতে বিচ্ছেদ হয়েছে ৫ হাজার ৫২১টি—অর্থাৎ প্রায় ৬৮ শতাংশ! বগুড়ায় একই বছরে ২২ হাজার ১৯৮টি বিয়ের বিপরীতে বিচ্ছেদ হয়েছে ১২ হাজার ১৪টি, অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে এক হাজার পরিবার আলাদা হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, প্রতি হাজারে ১০.৮ জন নারী বিয়েবিচ্ছেদ করেছেন, যেখানে পুরুষের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ১.৫। মাসে ভাঙছে ৮৪৩টিরও বেশি পরিবার। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—তালাকের নোটিশ পাঠানোদের প্রায় ৭০ শতাংশই নারী। এদের মধ্যে অভিজাত, বিত্তবান ও স্বাবলম্বী কর্মজীবী নারীর সংখ্যাই বেশি।

Advertisements

মানিয়ে নেওয়ার চাপ

বর্তমানে দেশের প্রায় ১৭.৪ শতাংশ পরিবার নারীর নেতৃত্বে চলছে—যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। কিন্তু এই আর্থিক স্বাবলম্বন কি নারীর জীবন সহজ করেছে? নাকি সমাজ তাঁকে আরও কঠিন পরীক্ষার মুখে ঠেলে দিচ্ছে?

কোনো নারী বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিলেই সমাজ প্রশ্ন তোলে—‘মানিয়ে নিতে পারলেন না কেন?’ কিন্তু খুব কমই জিজ্ঞেস করে—‘তিনি কী সহ্য করছিলেন?’

৩৮ বছর বয়সী শারমিন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তাঁর ১০ বছরের দাম্পত্য জীবনে শারীরিক নির্যাতন না থাকলেও ছিল প্রতিদিনের অপমান, নিয়ন্ত্রণ আর বেকার স্বামীর ‘আর্থিক অত্যাচার’। শারমিন বলেন, ‘আমার নিজের আয়ের টাকায়ও আমার কোনো স্বাধীনতা ছিল না। একদিন বুঝলাম, আমি নিজের ঘরেই বন্দি।’

বিচ্ছেদের পর সবচেয়ে বড় আঘাতটি তিনি পেয়েছেন নিজের পরিবার থেকেই। মায়ের সেই প্রশ্ন—‘আরেকটু সহ্য করলে কী হতো?’—আজও তাঁকে তাড়া করে ফেরে। এখন তিনি একা থাকেন, স্বনির্ভর। কিন্তু সমাজের চোখে তিনি এখনো ‘ঝুঁকিপূর্ণ’।

একা মায়ের দ্বিগুণ যুদ্ধ

বিচ্ছেদের পর নারীর সংকট কেবল অর্থনৈতিক নয়, তার চেয়েও বেশি সামাজিক। আত্মীয়দের নীরব প্রশ্ন, প্রতিবেশীর কৌতূহলী দৃষ্টি, সহকর্মীদের অযাচিত সহানুভূতি—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক ধরনের অদৃশ্য কারাগার।

৪২ বছর বয়সী আফসানা পাঁচ বছর ধরে একা মেয়েকে বড় করছেন। সন্তানের স্কুলে কোনো সমস্যা হলেই প্রথম প্রশ্ন আসে—‘বাবা কোথায়?’ তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে ভালো করলে সেটা স্বাভাবিক, খারাপ করলেই দোষ আমার—কারণ আমি একা মা।’

বাসা ভাড়া নিতে গিয়েও তাঁকে শুনতে হয়, ‘আপনাদের সঙ্গে কোনো পুরুষ নেই?’ তাঁর কথায়, “একক মা হওয়া মানে শুধু দ্বিগুণ দায়িত্ব নয়, বরং দ্বিগুণ নজরদারি।”

অযাচিত উপদেশ আর সামাজিক পাহারা

৩৫ বছর বয়সী তানিয়া প্রথম বিয়ের পর আর দ্বিতীয়বার বিয়ে করেননি। একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ করেন। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বিরক্তিকর বিষয়—প্রতিদিনের সেই একই প্রশ্ন: ‘এখনো বিয়ে করোনি কেন?’ ‘একা থাকতে ভয় লাগে না?’

তানিয়া বলেন, ‘আমি একা থাকি বলেই সবাই মনে করে আমাকে রক্ষা করতে হবে, শাসন করতে হবে, উপদেশ দিতে হবে। যেন পরিবারে পুরুষ না থাকা মানেই আমি অরক্ষিত।’

সমাজ কি নারীর পাশে দাঁড়াবে?

মানবাধিকারকর্মী ও ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়ক খুশি কবীর বলেন, ডিভোর্সড বা একা থাকা নারীরা সন্তানের স্কুলে ভর্তি থেকে শুরু করে বাসা ভাড়া—প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাধার মুখে পড়েন। তাঁর ভাষায়, ‘নারীর স্বামী না থাকা বা সন্তানের বাবা না থাকাটাকে যেন সমাজ মহাপাপ হিসেবে দেখে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কোনো নারীই একা থাকতে চান না। কিন্তু যখন স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়, তখন সেই ট্রমা কাটিয়ে উঠে ঘুরে দাঁড়ানোই হয় সবচেয়ে বড় লড়াই। সেই লড়াইয়ে সমাজ যদি পাশে না দাঁড়িয়ে উল্টো তাকে দমিয়ে দেয়, তাহলে সেটা শুধু নারীর নয়—পুরো সমাজের ব্যর্থতা।’

যেখানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী, সেখানে এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে মানসিক চাপে রেখে কোনো সমাজ বা রাষ্ট্র এগিয়ে যেতে পারে না।

Advertisements