হার মানতে শেখেনি হোসনেআরা

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম নেওয়া হোসনেআরা আক্তারের জীবন শুরু থেকেই সংগ্রামে ভরা। জন্মগতভাবে দুই পা ও ডান হাত অচল পুরো শরীরে কেবল বাঁ হাতটিই তার ভরসা। তার ওপর আছে চরম দারিদ্র্যের চাপ। তবু এই কিশোরী থেমে থাকেনি। তার একটাই স্বপ্ন পড়াশোনা শেষ করে একদিন শিক্ষক হবে।
রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের মহিধর খণ্ডক্ষেত্র গ্রামের বাসিন্দা হোসনেআরা বর্তমানে সিংহীমারী দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। কোনো চিকিৎসাই তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি করতে পারেনি। মেয়ের চিকিৎসার পেছনে বাবা হোসেন আলী একসময় নিজের ১৬ শতক জমিও বিক্রি করে দিয়েছেন। কিন্তু ফল মেলেনি।
তবু মেয়ের পড়াশোনার আগ্রহ দেখে বাবা হাল ছাড়েননি। বাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের স্কুলে তাকে ভর্তি করান। প্রতিদিন ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে বাইসাইকেলের পেছনে বসিয়ে মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দেন।
মেয়ের স্বপ্ন আগলে রাখতে গিয়ে হোসেন আলী নিজের জীবিকার পথও সংকুচিত করেছেন। আগে তিনি ভ্যান চালাতেন। কিন্তু মেয়েকে নিয়মিত স্কুল ও প্রাইভেটে আনা–নেওয়ার কারণে সেই কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। এখন অন্যের জমিতে বর্গাচাষ করেই কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন।
কথা বলতে গিয়ে হোসেন আলী বলেন, ‘মেয়েকে একা রেখে বাইরে কাজে যেতে পারি না। বারবার স্কুলে নিয়ে যাওয়া–আনা করতে হয়। সংসার চালানো এখন খুব কষ্টের।’
হোসনেআরার সহপাঠীরাও তাকে আলাদা চোখে দেখে না। তার বান্ধবী সুমাইয়া আক্তার বলে, ‘ও আমাদেরই একজন বন্ধু। ও যে প্রতিবন্ধী, সেটা আমরা ওকে বুঝতেই দিই না।’
বিদ্যালয়ের শিক্ষক আবু সুফিয়ান জানান, হোসনেআরা অত্যন্ত মেধাবী ও মনোযোগী ছাত্রী। তার পড়াশোনার আগ্রহ অন্য শিক্ষার্থীদের জন্যও অনুপ্রেরণা।
নিজের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে হোসনেআরা বলে, ‘আমি পড়াশোনা খুব ভালোবাসি। যদি একটা মোটরচালিত হুইলচেয়ার থাকত, তাহলে নিজেই স্কুলে যেতে পারতাম। বাবার কষ্টটা অনেক কমে যেত।’
হোসনেআরার এই সংগ্রামের কথা ইতিমধ্যে প্রশাসনের নজরেও এসেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল ইমরান জানিয়েছেন, এই শিক্ষার্থীর কষ্ট লাঘবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শারীরিক সীমাবদ্ধতা আর দারিদ্র্যের দেয়াল পেরিয়ে হোসনেআরা যে স্বপ্নের দিকে এগিয়ে চলছে—সে গল্প এখন অনেকের কাছেই নতুন করে সাহস জোগাচ্ছে।



