খামেনির ছবিতে আগুন দিয়ে সিগারেট ধরাচ্ছেন ইরানি নারীরা

ইরানে প্রতিবাদের ভাষা যেন দিন দিন আরও অভিনব ও আরও দুঃসাহসী হয়ে উঠছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রেডিট, এক্স, ইনস্টাগ্রাম ও টেলিগ্রামে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিও নতুন করে আলোড়ন তুলেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, কিছু ইরানি নারী দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবিতে আগুন ধরিয়ে সেই আগুনেই সিগারেট জ্বালাচ্ছেন।
সাধারণ চোখে এটি হয়তো একটি নাটকীয় দৃশ্য মাত্র। কিন্তু ইরানের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই কাজ সরাসরি শাসনব্যবস্থার প্রতি প্রকাশ্য বিদ্রোহের শামিল। কারণ দেশটির আইনে সর্বোচ্চ নেতার ছবি পোড়ানো বা অবমাননা করা গুরুতর অপরাধ। এর শাস্তি দীর্ঘ কারাদণ্ড থেকে শুরু করে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
তবুও কেন নারীরা এমন ভয়ংকর ঝুঁকি নিচ্ছেন?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে ইরানের সমাজব্যবস্থা ও রাজনীতির ভেতরের চাপা ক্ষোভে। ইরানে নারীদের প্রকাশ্যে ধূমপান করাকে সামাজিকভাবে ভালো চোখে দেখা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে এটিকে অনৈতিক আচরণ হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। ফলে খামেনির ছবিতে আগুন দিয়ে সিগারেট ধরানো একসঙ্গে দুই ধরনের বার্তা বহন করছে—রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতি প্রকাশ্য অবজ্ঞা এবং পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ।
এই প্রতিবাদের শিকড় আরও গভীরে। ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যে ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তার রেশ আজও পুরোপুরি কাটেনি। রাজপথে বড় জমায়েত দমন করতে নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর অবস্থানে থাকলেও, এই ধরনের ছোট কিন্তু তীব্র প্রতীকী প্রতিবাদ পুরোপুরি থামানো যাচ্ছে না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট। ২০২৬ সালের শুরুতে ইরানি মুদ্রার মান ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে—এক ডলার প্রায় ১৪ লাখ রিয়ালের সমান। নিত্যপণ্যের লাগামছাড়া দামে সাধারণ মানুষের জীবন কার্যত দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। অনেকেই এই পরিস্থিতির জন্য সরাসরি সর্বোচ্চ নেতৃত্বকেই দায়ী করছেন। সেই জমে থাকা ক্ষোভেরই আগুন দেখা যাচ্ছে খামেনির ছবিতে।
ডিজিটাল দুনিয়ায় এই ঘটনাকে অনেকেই দেখছেন ‘ডেফায়েন্স’ বা প্রকাশ্য অবাধ্যতার প্রতীক হিসেবে। ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওর নিচে এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “যে ছবির সামনে আমাদের নীরব থাকতে শেখানো হয়েছিল, আজ সেই আগুনেই আমাদের ক্ষোভের সিগারেট জ্বলছে।”
তবে ইরানের রাষ্ট্রযন্ত্রও চুপ করে নেই। দেশটির বিচার বিভাগ জানিয়েছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে কয়েকজনকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের খবরও এসেছে। কিন্তু ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও ধরপাকড়ের মধ্যেও এসব ভিডিও ছড়িয়ে পড়া থামানো যাচ্ছে না।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রায় সবকটিতেই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। গত বুধবার এক দিনেই অন্তত ৩৭ জন নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। সর্বশেষ হিসাবে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ জনে।
এই উত্তাল পরিস্থিতিতে নারীদের এমন ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রতীকী প্রতিবাদ ইঙ্গিত দিচ্ছে—ইরানে ক্ষোভ শুধু রাজপথে নয়, মানুষের মানসিকতার গভীরেও জমে উঠেছে। আর সেই ক্ষোভ এখন আগুন হয়ে বেরিয়ে আসছে শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে শক্ত প্রতীককেই লক্ষ্য করে।



