হাজার জীবনের ভরসা ‘নারী’

‘আগে আমাদের সংসারে নিত্যদিনই অভাব লেগে থাকত। সন্তানদের নিয়ে কীভাবে যে দিন পার হতো, তা ভাষায় বোঝানো যাবে না। এখন আর সেই কষ্ট নেই। শান্তিতে আছি।’
কথাগুলো বলতে বলতে চোখ ভিজে উঠছিল উলিপুর উপজেলার গুনাইগাছ ইউনিয়নের কৃষ্ণমঙ্গল গ্রামের বিধবা আয়শা বেগমের (৫০)।
তালাকপ্রাপ্ত, স্বামী পরিত্যক্ত ও চরম দারিদ্র্যে থাকা এক হাজার নারী আজ নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন। এই পরিবর্তনের নেপথ্যে আছেন উদ্যোক্তা ফরিদা ইয়াসমিন। একটি এনজিও—বিডিএসসি’র প্রকল্পে কাজ করার সুবাদে ২০১৪ সালে তিনি এসব অসহায় নারীর পাশে দাঁড়ান। নানা সীমাবদ্ধতা ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও ধীরে ধীরে নারীরা যখন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন, তখন ২০১৬ সালে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।
কিন্তু ফরিদা ইয়াসমিন থেমে যাননি। হতদরিদ্র নারীদের হাত ছাড়েননি তিনি। নতুন করে গড়ে তোলেন ‘নারী অ্যাসোসিয়েট ফর রিভাইভাল অ্যান্ড ইনিশিয়েটিভ (নারী)’ নামের একটি সংগঠন। শুরুটা ছিল চার শতাধিক পথভ্রষ্ট ও সমাজচ্যুত নারীকে নিয়ে। মাত্র দুই থেকে ২৫ টাকা সঞ্চয়ের মাধ্যমে শুরু হয় তাদের আত্মনির্ভরতার লড়াই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারাই হয়ে ওঠেন প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক ও অংশীদার।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব জমিতে দ্বিতল ভবনসহ কয়েক কোটি টাকার সম্পদে পরিণত হয়েছে। এখানে নারীরা পাটের আঁশ দিয়ে হাতে তৈরি করছেন পরিবেশসম্মত পাপোশ, টেবিলম্যাট, শিকা, মেকআপ ব্যাগ, ফেবরিক্সের ব্যাগ, ঝুড়ি, টেবিল রানার, বেণি, শোপিস, ঘর সাজানোর পণ্য, সুতলি ও দৃষ্টিনন্দন ব্যবহার্য বহুমুখী পণ্য। তাদের তৈরি এসব পণ্য রপ্তানি হচ্ছে আমোরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও চীনে। বছরে প্রায় ২০ লাখ টাকার পণ্য বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। পাটের তৈরি এসব জিনিসপত্রের চাহিদা ও বাড়তি উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও দেশীয় ক্রেতা না পাওয়ায় বাজারজাত করতে পারছেন না তারা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, স্বল্প সুদে ঋণ কিংবা ব্যক্তি পর্যায়ে আর্থিক সহায়তা পেলে এ অঞ্চলের নারীদের যেমনি কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হবে, তেমনি হাজার হাজার নারী পাবে স্বপ্নের ঠিকানা। এ ছাড়া সংগঠনটি বিভিন্ন দুর্যোগকালীন সময় আর্তমানবতার সেবায় কাজ করে।
উলিপুর পৌরসভার রামদাস ধনিরাম এলাকায় গড়ে ওঠা ‘নারী’ প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা যায় নারীদের কর্মচাঞ্চল্য। সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত। কথা হয় কর্মরত শ্রমিক আফরোজা বেগম, মৌসুমী বেওয়া, সালমা বেগম, বেবী আক্তারসহ অনেকের সঙ্গে। তারা জানান, শুরুতে মাসে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা পেলেও এখন পাচ্ছেন চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। এ ছাড়া পাঁচ হাজার নারী অর্ডার নিয়ে বাড়িতে বসে কাজ করেন। এ কাজের সুবিধা হচ্ছে, সাংসারিক কাজের ফাঁকে ফাঁকে তারা এ কাজ করে বাড়তি আয় করছেন।
শ্রমিক মমিনা বেগম বলেন, আগে সামাজিকভাবে আমাদের ঘৃণা ও অবহেলা করা হতো। এখন পরিবারের লোকজনসহ সমাজের সবাই আমাদের সম্মান করে। এখানে কাজ শিখে অনেকে নিজেরাই উদ্যোক্তা হয়েছি। এমন দুজন উদ্যোক্তা নুরিমা বেগম ও লাভলী বেগম বলেন, এ কাজ করে উদ্যোক্তা হয়েছি। নিজের অভাব দূর করে অনেক অসহায় নারীকে আলোর পথ দেখাচ্ছি। অসহার নারীর ঠিকানা এখন নারী।
জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত নারীর নির্বাহী পরিচালক ফরিদা ইয়াসমিন সমকালকে বলেন, একটি সেলাই মেশিন দিয়ে শুরু করলেও বর্তমানে ১০টি সেলাই মেশিন, ৫০টি তাঁত দিয়ে পণ্য তৈরি করা হচ্ছে। দেশি ক্রেতা না পাওয়ায় অর্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে আপাতত তাঁতের কাজ বন্ধ রয়েছে।
কুড়িগ্রামের বিসিকের উপব্যবস্থাপক শাহ মোহাম্মদ জোনায়েদ বলেন, নারী সংগঠনটি একটি হস্তশিল্প ও উৎপাদনমুখী ভালো প্রতিষ্ঠান। আমরা তাদের সব ধরনের সহায়তা ও পরামর্শ দিয়ে থাকি। উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, নারী সংগঠনটি পরিবেশবান্ধব পাটের পণ্য তৈরি করছে। আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংগঠনটিকে সব ধরনের সহায়তা দেব।



