শেষ মানেই নতুনের সূচনা

দেখতে দেখতে বছর তো শেষ হয়ে গেল। আরো একটি বছর জীবন থেকে ফুরিয়ে গেল। তবে জীবনের শেষ বলে কি আদৌ কিছু আছে? যে কোন কিছু শেষ মানেই নতুন কিছু শুরু, ইহা চিরন্তন সত্য। তবুও কোথাও গিয়ে শেষ শব্দ টা শুনলে থমকে উঠি আমরা।
দিনভর তপ্ত রোদ ছড়িয়ে যখন বিকেলের শেষ প্রহরটুকু পেরিয়ে যায়, তখন আকাশের গায়ে আরক্তিম রঙ মেখে সূর্য ধীরে ধীরে দিগন্তে মিলিয়ে যায়। তার সঙ্গে সঙ্গে চরাচরজুড়ে নামতে শুরু করে আঁধারের পর্দা। তবে সেই আঁধার সব সময় একরকম হয় না। কখনো তা নিকষ কালো, কখনো আবার মিহি ও স্বচ্ছ এক আবরণ যার ঘনত্ব নির্ভর করে চাঁদ আর নক্ষত্রের উপস্থিতির ওপর।
অমাবস্যার রাতে আঁধার যেন আরও ভারী হয়ে নেমে আসে। চারপাশে আলো কম থাকায় কৃত্রিম আলোর সহায়তা ছাড়া পথ চলাই হয়ে ওঠে কঠিন। আবার পূর্ণিমার রাতে দৃশ্যপট বদলে যায় সম্পূর্ণ। আঁধারের স্তর তখন পাতলা, রুপালি আলোয় ভিজে ওঠে চারদিক। খালি চোখেই দেখা যায় অনেক দূরের পথ, প্রকৃতি যেন তখন নিজের সৌন্দর্য উজাড় করে দেয়।
এখানেই শেষ নয়। চাঁদের সঙ্গে সঙ্গে নক্ষত্ররাও এই মহাজাগতিক খেলায় সমান অংশীদার। আকাশের গায়ে রাশি রাশি তারা কখনো খই ছড়ানো জমিনের মতো, কখনো বা নকশিকাঁথার ফুলের থোকা থোকা অলংকরণ। তারা মিটিমিটি জ্বলে ছড়িয়ে দেয় হলদে আলোর কোমল আভা। এই আলো, এই অন্ধকার সব মিলিয়ে প্রকৃতির এক অপার মহিমা, এক নিরন্তর চলমান খেলা।
এই খেলার নিয়মই এমন যত গভীরই হোক রাত, তা স্থায়ী নয়। সময়ের নিয়ম মেনে আঁধার সরে যায় ঊষালগ্নে। আবার সূর্য ওঠে নতুন উদ্যমে, নিজের দাপট আর আলো নিয়ে। পৃথিবীর জীবন এই চক্রেই বাঁধা দিনের পর রাত, রাতের পর দিন।
মানুষের জীবনও এর ব্যতিক্রম নয়। এই গ্রহের সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী হিসেবেও মানুষের জীবন কখনো অমাবস্যার মতো অন্ধকার, কখনো পূর্ণিমার মতো আলোকোজ্জ্বল। আবার কখনো এই দুয়ের মাঝামাঝি এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ছবি। তাই সূর্য ডুবে গেলেই সব শেষ এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। অন্ধকার মানেই সমাপ্তি নয়; বরং তা নতুন সকালের প্রস্তুতি। আবার আসবে ভোর, আকাশ হাসবে, আর জীবন জেগে উঠবে নতুন করে, নতুন আশায়।
প্রত্যেক মানুষের জীবনেই আসে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত সময় যেগুলো কেউ চায় না, তবু এড়িয়ে যাওয়ার উপায়ও নেই। তবে সবাই এসব মুহূর্ত একইভাবে সামাল দিতে পারে না। কেউ ভেঙে পড়ে, আবার কেউ দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। কারণ মানুষ ভিন্ন, তাই ভিন্ন তাদের সহ্যক্ষমতা, মানসিক শক্তি আর প্রতিরোধের সামর্থ্য। যারা লড়াই করতে জানে, তারা হার জেনেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজেকে সচল রাখে। আর যাদের মন দুর্বল, তারা সামান্য ধাক্কাতেই দিশেহারা হয়ে পড়ে সূর্য ডুবলেই ভাবে—সব বুঝি শেষ।
বিশেষ করে এখন, যখন ক্যালেন্ডারের পাতায় ডিসেম্বর। বছরের শেষ মাস। আর কদিন পরই শেষ হবে ২০২৫ সাল। তারপর কি জীবন থেমে যাবে? পৃথিবী কি থমকে দাঁড়াবে? না ডিসেম্বর ৩১-এর পর যথারীতি আসবে ১ জানুয়ারি ২০২৬। কেবল তারিখ বদলাবে, ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টাবে। জীবনের স্রোত ঠিকই বহমান থাকবে। কারণ দিন-তারিখ বদলায়, কিন্তু জীবন থামে না।

কথায় বোঝা যত সহজই হোক, বাস্তবে সামলে ওঠা সব সময় সম্ভব হয় না এটাই সত্য। মনের আকাশ যখন ঘোর অন্ধকারে ঢেকে যায়, চাঁদ-তারা তো দূরের কথা, কৃত্রিম আলোও যদি না দেখা যায়, তবু হাল ছেড়ে দেওয়া মানবিক গুণ নয়। মানুষ অনেক কিছু সামলাতে পারে, কিন্তু সবকিছু একা পারা যায় না এ জন্যই মানুষ সামাজিক।
কখনো কাছের মানুষের সহায়তা দরকার হয়, আবার পরিস্থিতি গুরুতর হলে প্রয়োজন পড়ে পেশাদার বিশেষজ্ঞের। মানসিক বিষয়ে সমাজের ভুল ধারণা অনেককে দ্বিধায় ফেলে, ঝুঁকি বাড়ায়। অথচ ‘লোকে কী বলবে’ ভেবে সাহায্য না নেওয়াই সবচেয়ে বড় ভুল। তাই যদি মনে হয় মনের ভার নিজে বা আশপাশের সহায়তায় নামছে না, তবে দেরি নয় পেশাদার মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা মনোবিশ্লেষকের কাছে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
জীবন সুন্দর হোক এই কামনাই শেষ কথা। হোক না পথ কিছুটা বন্ধুর, সময় কখনো প্রতিকূল, তবু বিশ্বাস থাকুক আলোর ফেরার। কারণ প্রতিটি অন্ধকারই ভোরের প্রস্তুতি, প্রতিটি থেমে যাওয়া মানেই শেষ নয়। নতুন সম্ভাবনার দ্যুতিতে আবারও আলোকোজ্জ্বল হোক জীবন আশা, সাহস আর এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ়তায়।



