সাবিহা খাতুনের হাত ধরে স্বাবলম্বী দুই শতাধিক নারী

মাত্র ২০০ টাকার সুতা দিয়ে যাত্রা শুরু করে আজ মাসে লাখ টাকা মূল্যের পণ্য বিক্রি করছেন জয়পুরহাটের সাবিহা খাতুন। নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি গ্রামের দুই শতাধিক নারীকে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়ে তিনি এখন এলাকায় অনুপ্রেরণার প্রতীক।
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার পুনট ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা সাবিহা খাতুন। তিনি জয়পুরহাট সরকারি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। ২০১২ সালে তার বিয়ে হয় কালাই পৌরসভার কাজীপাড়ার আবু সুফিয়ান পলাশের সঙ্গে।
পড়াশোনা ও সংসারের পাশাপাশি গ্রামীণ নারীদের নিয়ে কিছু করার স্বপ্ন দেখতেন সাবিহা। বিশেষ করে যেসব নারী অবসর সময়ে ঘরে বসে থাকেন, তাদের আয়মুখী কাজে যুক্ত করার আগ্রহ থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার ভাবনা আসে তার মনে। তবে সময় ও সুযোগের অভাবে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছিল না।
করোনার সময় সেই সুযোগ তৈরি হয়। ঘরে বসে নিজের সন্তানের জন্য একটি শীতের জামা তৈরি করেন সাবিহা। সেটি দেখে প্রতিবেশীরা তার কাছে জামা বানানোর অর্ডার দেন। তখন ২০০ টাকা দিয়ে সুতা ও প্রয়োজনীয় উপকরণ কিনে কাজ শুরু করেন তিনি।
এ সময় গ্রামের পাঁচজন নারী তার কাছ থেকে হস্তশিল্পের কাজ শেখার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে একসঙ্গে কাজ শুরু করেন সাবিহা। পরে মুঠোফোনে বিভিন্ন হস্তশিল্প পণ্যের নকশা দেখে নতুন নতুন পণ্য তৈরি করেন তারা। অনলাইনে ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য সাবিহা ফেসবুকে ‘সোহা হস্তশিল্প’ নামে একটি পেজ খোলেন—যা তাঁর মেয়ের নামে রাখা।
এই পেজের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অর্ডার পেতে শুরু করেন তিনি। প্রথম মাসেই ৩০ হাজার টাকা আয় হয়। এরপর ধীরে ধীরে তার উদ্যোগে যুক্ত হন আরও অনেক নারী।
বর্তমানে জয়পুরহাট সদর, পাঁচবিবি ও কালাই উপজেলায় সাবিহা খাতুনের আটটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রে নারীদের হস্তশিল্পের কাজ শেখানো হয়। শীতের চাদর, পঞ্চ, টুপি, বেবি নেট, টেবিলম্যাট, টিস্যুবক্সের কভার, ব্যাগসহ মোট ৩২ ধরনের পণ্য তৈরি হচ্ছে। এসব পণ্য এনজিও ও আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, মালয়েশিয়া, জার্মানি ও দক্ষিণ কোরিয়ায় রপ্তানি হচ্ছে।
পাঁচবিবি উপজেলার কলেজছাত্রী রাজিয়া আক্তার বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি এই কাজ করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতে পারছেন তিনি।
সাবিহা খাতুন জানান, বর্তমানে তার পাঁচ লক্ষাধিক টাকার মালামাল রয়েছে। মাসে অন্তত আড়াই লাখ টাকার পণ্য বিক্রি হচ্ছে। সম্প্রতি একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ১০ হাজার শীতের টুপির অর্ডার পেয়েছেন তিনি।
সাবিহার স্বামী আবু সুফিয়ান পলাশ বলেন, স্ত্রীর উদ্যোগে অনেক বেকার নারী আজ স্বাবলম্বী হয়েছেন—এটি তাদের পরিবারের জন্যও গর্বের বিষয়।
জয়পুরহাট বিসিকের উপব্যবস্থাপক লিটন চন্দ্র ঘোষ জানান, বিসিকের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সাবিহা খাতুন জেলার একজন সফল উদ্যোক্তা। তার হাত ধরে দুই শতাধিক নারী স্বাবলম্বী হয়েছেন।
গ্রামীণ নারীদের ক্ষমতায়নে বিশেষ অবদানের জন্য সাবিহা খাতুনকে ‘জয়িতা পুরস্কার’ প্রদান করা হয়েছে।



