বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬
নারী

বন–জঙ্গলে প্ল্যাকার্ড হাতে পরিবেশের বার্তা ছড়ান তাসফিয়া তাহসিন

Untitled-1

বনভূমির মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাতে একটি প্ল্যাকার্ড, লাল অক্ষরে লেখা, “হর্ন বাজিয়ে প্রাণীদের বিরক্ত করবেন না”। আবার কখনো সাগরের পাড়ে, কখনো পাহাড়ের চূড়ায় কিংবা হাওরের কিনারায় একই দৃশ্য। পরিবেশ ও বন্য প্রাণী রক্ষার বার্তা ছড়িয়ে দিতে দেশের নানা প্রান্তে এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছেন তরুণ আলোকচিত্রী ও পরিবেশকর্মী তাসফিয়া তাহসিন। কাছের মানুষদের কাছে যিনি পরিচিত ‘পূর্ণতা’ নামে।

হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান, সুন্দরবন, কক্সবাজারের অদূরের সোনাদিয়া দ্বীপ এমন বহু পরিবেশ-সংবেদনশীল এলাকায় একাই প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে মানুষকে সচেতন করতে দেখা গেছে তাকে। তার প্ল্যাকার্ডে লেখা থাকে “সুন্দরবন বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে”, “বাংলার ফুসফুস সুন্দরবনকে রক্ষা করো”, “সোনাদিয়ার প্রাণিবৈচিত্র্য রক্ষা করো”।

কৈশোর পেরোনো এই তরুণীর উদ্যোগ অনেকের মনে করিয়ে দেয় সুইডিশ পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গের কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতির মধ্যেও থেমে নেই পূর্ণতার পরিবেশ রক্ষার প্রচেষ্টা। ছবি তোলার পাশাপাশি সচেতনতার এই কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

আলোকচিত্র থেকেই সচেতনতার শুরু

Advertisements

শৈশবেই ক্যামেরার সঙ্গে পরিচয় পূর্ণতার। তবে বন্য প্রাণী ও পাখির ছবি তোলার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় কৈশোরে। সেই শুরুটা হয়েছিল ২০২০ সালের জানুয়ারিতে। পরিবারসহ কিশোরগঞ্জের নিকলীতে বেড়াতে গিয়ে প্রথমবারের মতো কিছু অচেনা পাখির দেখা পান তিনি। পুকুরে বারবার ডুব দেওয়া পাখিগুলোর ছবি তুলতে গিয়ে কাঁপা হাতে ক্যামেরার শাটার চাপেন পূর্ণতা। পরে জানতে পারেন, সেগুলো সবুজ সুইচোরা বা বাঁশপাতি পাখি।

এই অভিজ্ঞতাই তাকে নিয়ে যায় ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফির পথে। ছবি তুলতে তুলতেই গণমাধ্যম ও গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানতে পারেন, দেশে দ্রুত কমে যাচ্ছে পাখি ও বন্য প্রাণীর সংখ্যা। বিষয়টি গভীরভাবে নাড়া দেয় তাকে। তখনই সিদ্ধান্ত নেন—শুধু ছবি তুললেই হবে না, মানুষকে সচেতন করাও জরুরি।

প্ল্যাকার্ড হাতে প্রতিবাদ

২০২২ সালে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে বেড়াতে গিয়ে পূর্ণতা লক্ষ্য করেন, উদ্যানের ভেতর দিয়ে চলাচলকারী সড়কে নির্ধারিত গতিসীমা ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটার হলেও অধিকাংশ চালক তা মানেন না। দ্রুতগতির গাড়ি ও অতিরিক্ত হর্নের কারণে প্রায়ই বন্য প্রাণী মারা যাচ্ছে। তখনই তিনি হাতে একটি প্ল্যাকার্ড তুলে নেন— “গতিসীমা মেনে চলুন, প্রাণী হত্যা রোধ করুন”।

এরপর থেকে মৌলভীবাজারের বাইক্কা বিল, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, চট্টগ্রামের হাজারিখিল বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য, রাজশাহীর পদ্মার চরসহ যেখানেই ছবি তুলতে গেছেন, সেখানেই চালিয়েছেন সচেতনতামূলক প্রচারণা।

পরিবারের সমর্থন

পূর্ণতার এই কাজে পাশে আছেন তার মা–বাবা। বাবা জিয়াউর রহমান ও মা কামরুন নাহার শরমিন পেশায় সাংবাদিক। নিজেদের অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘অর্থসূচক’-এর সঙ্গে যুক্ত তারা। মেয়ের উদ্যোগে উৎসাহ জোগান, সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়ান দেশের নানা প্রান্তে।

ভবিষ্যৎ স্বপ্ন

বন্য প্রাণী ও পাখির ছবি তোলার পাশাপাশি ছবি আঁকতেও ভালোবাসেন পূর্ণতা। নিজের তোলা ও আঁকা ছবিগুলো নিয়ে একটি প্রদর্শনীর স্বপ্ন দেখছেন তিনি। সেই প্রদর্শনী থেকে প্রাপ্ত অর্থ বন, পাহাড় ও হাওরঘেঁষা এলাকার প্রান্তিক ও নৃগোষ্ঠীর শিশু-কিশোরদের সহায়তায় ব্যয় করতে চান।

Advertisements