বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬
নারী

নারী আন্তর্জাতিক বক্সিংয়ে হিজাব: নিরাপত্তা, প্রথা নাকি পরিচয়ের লড়াই?

Untitled-3

১৩ বছর বয়সী জেইনা নাসার সেদিন বার্লিনের ঘরে বসে মা–বাবাকে শান্ত গলায় বলছিলেন—তিনি বক্সিং করতে চান। কোনো একগুঁয়েমি নয় যুক্তি দিয়ে বোঝালেন, ব্যায়াম তার মনোযোগ বাড়াবে, সে শুধু মেয়েদের জিমে যাবে, আর বক্সিং মূলত শৃঙ্খলা ও সম্মানের খেলা। মেয়ের কথা শুনে বাবা–মা রাজি হলেন। কিন্তু জেইনা জানতেন—অভিভাবককে রাজি করানো সহজ, সত্যিকারের লড়াইটা শুরু হবে রিংয়ে নামার আগেই।

জার্মানিতে জন্ম নেওয়া লেবানিজ বংশোদ্ভূত জেইনা ইউটিউবে নারী বক্সারদের প্রশিক্ষণের ভিডিও দেখে খেলাটির প্রতি গভীর আকর্ষণ অনুভব করেন। ঘুষির শব্দ, গতির তীব্রতা আর শক্তি—সবই তাকে টানত। তিনি বলেন, “আমি শুধু দেখতাম আর ভাবতাম—এটাই আমার খেলা।”

কিন্তু জিমে ভর্তি হয়ে বুঝলেন, তার পথ খুব সহজ নয়। মুসলিম হিসেবে হিজাব তার পরিচয়ের অংশ; কিন্তু সে সময় জাতীয় বা আন্তর্জাতিক কোনো বক্সিং নিয়মেই হিজাব পরে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার অনুমতি ছিল না। নিয়ম পরিষ্কার—হিজাব খুলতে হবে, না হলে খেলাই যাবে না। জেইনার প্রশ্ন ছিল সহজ, “আমি কাউকে আঘাত করছি না, তাহলে কেন আমাকে পরিচয় ছাড়তে হবে?”

সেই প্রশ্নই তাকে নতুন লড়াইয়ের পথে নিয়ে গেল।

মাত্র ১৪ বছর বয়সে জেইনা জার্মান অপেশাদার বক্সিংয়ের পোশাকবিধি বদলে দিতে সক্ষম হন। নিয়ম সংশোধনের ফলে নারীরা এখন লম্বা হাতা পোশাক ও হেড স্কার্ফ পরেই রিংয়ে নামতে পারেন।

প্রথমবার রিংয়ে ওঠার সময় উত্তেজনায় শরীর কাঁপছিল ঠিকই, কিন্তু তার বেশি অনুভূত হচ্ছিল চারপাশের কৌতূহল। তবুও তিনি মন দিলেন শুধু খেলার প্রতি। তারপর একে একে জিতলেন বার্লিন ও জাতীয় পর্যায়ের বহু চ্যাম্পিয়নশিপ।

কিন্তু আন্তর্জাতিক স্তরে আবার বাধা—আইবিএ তখনো হিজাব অনুমোদন করেনি।

বৈশ্বিক মঞ্চে হিজাবের লড়াই

১৯ বছর বয়সে জেইনা আন্তর্জাতিক নিয়ম বদলের আন্দোলন শুরু করেন। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ২০১৯ সালে আইবিএ নারী বক্সারদের জন্য হিজাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। এরপর অলিম্পিক বক্সিং পরিচালনাকারী ওয়ার্ল্ড বক্সিংও পুরো শরীর ঢাকা পোশাকের অনুমতি দেয়।

জেইনার মতে, “এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় জয়।”

২০১৭ সালে নাইকি যখন অ্যাথলেটদের জন্য নতুন হিজাব বাজারে আনে, জেইনা হয়ে ওঠেন সেই প্রচারের প্রধান মুখ। কিন্তু প্রশ্ন উঠতে থাকে—হিজাব পরে বক্সিং কি নিরাপদ?

হিজাবের নিরাপত্তা বিতর্ক

কেউ কেউ দাবি তুলেছিলেন—রিংয়ে হিজাব খুলে যাওয়ার ঝুঁকি আছে, আবার কেউ বলেছিল এ দিয়ে নাকি বাড়তি ‘সুবিধা’ পাওয়া যেতে পারে। জার্মান বক্সিং ফেডারেশনের কিছু কর্মকর্তা উদ্বেগও প্রকাশ করেন।

জেইনার জবাব ছিল সরল, “প্রায় ১০০টি লড়াই করেছি। কোনোদিন হিজাব সমস্যা তৈরি করেনি।” চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরাও তার বক্তব্যের পক্ষে মত দেন।

পেশাদার অভিষেকে নতুন অধ্যায়

এবার শুরু হতে যাচ্ছে তার পেশাদারি যাত্রা—পাকিস্তানের লাহোরে। চার দিনের এই প্রতিযোগিতায় ২০ হাজারের বেশি দর্শক সমাগম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। হিজাব নিয়ে বিতর্ক পিছনে ফেলে রিংয়ে নিজের দক্ষতা দেখানোর অপেক্ষায় এখন জেইনা নাসার।

Advertisements