বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬
বিশ্লেষণ

প্রযুক্তির কল্যাণের আড়ালে সাইবার সহিংসতার মুখে নারীরা

Untitled-6

ডিজিটাল প্রযুক্তি আজ সভ্যতার চালিকাশক্তি একটি ক্লিকেই বদলে যাচ্ছে যোগাযোগ, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও বিনোদনের চেহারা। কিন্তু এই উজ্জ্বল পর্দার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার বাস্তবতা সাইবার সহিংসতা। এটি এমন এক সহিংসতা, যা চোখে দেখা যায় না, অথচ তার আঘাত গভীরভাবে নারীর জীবন, ও সমাজে ছাপ ফেলে।

ডিজিটাল দুনিয়ায় নারীর অসহায়তা

নারীরা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছেন সাইবার বুলিং, যৌন হয়রানি, ফটো ম্যানিপুলেশন, ডক্সিং, ভুয়া প্রোফাইল তৈরি ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মতো অপরাধের।

বাংলাদেশে সাইবার ক্রাইম ইউনিটের তথ্য বলছে—অনলাইন হয়রানির শিকারদের প্রায় ৭৫ শতাংশই নারী।

Advertisements

জাতিসংঘের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়

আরব অঞ্চলে ৬০ শতাংশ নারী ইন্টারনেট ব্যবহারকারী অনলাইন সহিংসতার শিকার,

পূর্ব ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার ১২ দেশে ৫০ শতাংশ নারী প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতার মুখে,

সাবসাহারান অঞ্চলের ৫টি দেশে ২৮ শতাংশ নারী আক্রান্ত,

আর ডেনমার্ক, ইতালি, নিউজিল্যান্ড, স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্রে ১৮ থেকে ৫৫ বছর বয়সী ২৩ শতাংশ নারী অন্তত একবার হলেও অনলাইন হয়রানির শিকার হয়েছেন।

বাংলাদেশের বিভিন্ন জরিপেও ছবিটা ভিন্ন নয় ২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৬৩ শতাংশ নারী অনলাইন সহিংসতার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। অন্যদিকে, আরেক জরিপে এই হার ৭৮ শতাংশ পর্যন্ত। এ তথ্য শুধু পরিসংখ্যান নয়, বরং সমাজের নারীর নিরাপত্তার গভীর সংকেত।

যখন প্রযুক্তি অস্ত্র হয়ে ওঠে

সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—এই সহিংসতা কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রযুক্তিগত কাঠামোর মিলিত ফল।

আজ ভুয়া প্রোফাইল তৈরি করে মানহানি, ব্যক্তিগত ছবি বিকৃত করে ছড়িয়ে দেওয়া, মেসেঞ্জারে অশালীন বার্তা বা হুমকি, ব্ল্যাকমেইল ও রিভেঞ্জ পর্ন—এসব নারীর অনলাইন জীবনে প্রতিদিনের বাস্তবতা।

নারীর অনলাইন উপস্থিতি যত বাড়ছে, ততই তার ডিজিটাল পরিচয়—ছবি, কণ্ঠ, তথ্য—লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার হাতিয়ার হয়ে উঠছে। প্রযুক্তি যেন নারীর শরীর, পরিচয় ও তথ্যকে রূপান্তর করছে এক ধরনের ডেটায়, যা আবার ব্যবহৃত হচ্ছে পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট, ডিপফেইক ভিডিও বা ব্ল্যাকমেইলের জ্বালানি হিসেবে।

ভয়, নীরবতা ও মানসিক ক্ষত

ভুক্তভোগী নারীদের অনেকেই সমাজ, পরিবার বা কর্মক্ষেত্রের প্রতিক্রিয়ার ভয়ে ঘটনাগুলো প্রকাশ করতে পারেন না। এই নীরবতা তাদের মানসিকভাবে আরও একা করে দেয়, তৈরি করে গভীর ট্রমা।

অনেক সময় সমাজই নারীকে দায়ী করে, ফলে তিনি নিজেই নিজের প্রতি সন্দিহান হয়ে পড়েন। এই মানসিক চাপই সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতা।

আইনের আওতায় নিরাপত্তা

বাংলাদেশে এখন কিছু আইনি কাঠামো রয়েছে—যেমন:

১.ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (২০২৪),

২.নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন,

৩.এবং সাইবার ক্রাইম ইউনিট, যেখানে ভুক্তভোগীরা সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারেন।

এছাড়া ৯৯৯, সাইবার হেল্প ডেস্ক, এবং এটুআই উইমেন সেফটি সেল থেকেও জরুরি সহায়তা পাওয়া যায়। তবে শুধু আইন যথেষ্ট নয়—প্রয়োজন প্রযুক্তিগত সচেতনতা ও সামাজিক মনোভাবের পরিবর্তন।

সচেতনতা ও শিক্ষা: পরিবর্তনের চাবিকাঠি

নারীর অনলাইন নিরাপত্তা একটি সামাজিক আন্দোলন হয়ে উঠতে পারে, যদি আমরা প্রযুক্তি ব্যবহারের সংস্কৃতি বদলাই।

প্রয়োজন

১.স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে ডিজিটাল সেফটি শিক্ষা,

২.নারীদের জন্য সাইবার লিটারেসি ও সিকিউরিটি প্রশিক্ষণ,

৩.এবং গণমাধ্যমে সচেতনতা প্রচারণা।

শুধু নারীরা নয়, পুরুষ ও তরুণ সমাজকেও এই শিক্ষার অংশ হতে হবে, যাতে প্রযুক্তি হয় সুরক্ষার হাতিয়ার, শোষণের নয়।

Advertisements