বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ২০ মে, ২০২৬
নারী

দেশে আশঙ্কাজনকভাবে কমছে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা

faltu

বাংলাদেশে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে কমে যাচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতি ও নারীর ক্ষমতায়নের জন্য বড় ধাক্কা। ইউএন উইমেনের সহযোগিতায় ২০২৫ সালের মে মাসে প্রকাশিত ‘জেন্ডারভিত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) প্রায় ২১ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, যার মধ্যে ১৮ লাখই নারী, মোট চাকরি হারানো মানুষের প্রায় ৮৫ শতাংশ। বর্তমানে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ ১৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যা কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

নারী অধিকার কর্মীরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর পূর্ণ হলেও নারীর প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন গঠিত হলেও তার প্রতিবেদন সমালোচনার মুখে পড়ে এবং সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। তাদের মতে, কর্মসংস্থান হ্রাসের পাশাপাশি নারী নির্যাতন ও বিচারহীনতা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করেছে।

জনশক্তি রপ্তানি ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০২৫ সালের প্রথম পাঁচ মাসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, লেবানন ও জর্ডানে নারী শ্রমিক পাঠানো গত বছরের তুলনায় অর্ধেক। কোথাও আবার এক- চতুর্থাংশে নেমে এসেছে। তৈরি পোশাক খাতেও নারীর উপস্থিতি কমেছে। একসময় যেখানে মোট শ্রমিকের ৮০ শতাংশের বেশি নারী ছিলেন, এখন তা অনেক কম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপে দেখা যায়, ২০২৩ সালে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৪৫ লাখ ১০ হাজার, যা ২০২৪ সালে কমে দাঁড়ায় ২ কোটি ২৮ লাখ ৮০ হাজারে। একই সময়ে শ্রমশক্তির বাইরে থাকা নারীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২৪ লাখ।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, নারীর অংশগ্রহণ কমার পেছনে দুটি কারণ রয়েছে- পরিসংখ্যানগত সংজ্ঞার পরিবর্তন এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের বৃদ্ধি। আগে কৃষিকাজ বা গৃহপালিত পশু পালনকারী নারীরাও শ্রমশক্তির অন্তর্ভুক্ত হতেন কিন্তু এখন কেবল অর্থের বিনিময়ে কাজ করা নারীদের গণনা করা হয়। এছাড়া গার্মেন্টস সেক্টরে প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে নারী শ্রমিকের কাজ কমেছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব, নারী নির্যাতনের বৃদ্ধি এবং দুর্বল আইনি কাঠামো এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী। তার মতে, সরকারের এজেন্ডায় নারীর অবস্থান স্পষ্ট নয় এবং যৌন নির্যাতনের বিচার না হওয়ায় নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।’ আসক-এর তথ্যানুসারে, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১,৬২৫ জন। যা আগের বছরের তুলনায় বেশি। ধর্ষণ, হত্যা, পারিবারিক সহিংসতা বেড়েছে ১০-১৫ শতাংশ। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ধর্ষণের ঘটনা ছিল ৫১৬টি, আর চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই হয়েছে ৪৮১টি।

মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত ছিল ধর্ষণের দ্রুত বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। কিন্তু দক্ষ সরকারি আইনজীবীর ঘাটতি, পুলিশের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব এবং পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার দূর্বলতা নারীদের অনিশ্চয়তায় ফেলেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ধর্ষণের মামলা ছিল ৩৯২টি, যা জুনে বেড়ে হয় ৪৯২টি। একই সময়ে অপহরণের মামলার সংখ্যা ছয় মাসেই ৫১৭টি। যা আগের বছরের মোট সংখ্যাকে ছাড়িয়েছে।

নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভিন হক বলেন, গত বছর নারীদের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বি। কিন্তু সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই। তিনি সংসদে নারীর আসন বৃদ্ধি, সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে সংরক্ষিত আসন এবং বিকেন্দ্রীকরণের প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, ঐক্যমত কমিশনে আমাদের অংশগ্রহণ ছিল না। তাই প্রধান উপদেষ্টার কাছে চিঠি পাঠালেও কোনো সাড়া মেলেনি।