বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬
বিশ্লেষণ

শখ মানেই নিজের একটা আলাদা জগৎ

IMG_5025

আধুনিক মনোবিজ্ঞান বলছে, শখ বা হবি থাকা শুধু মানসিক প্রশান্তির জন্য নয়, বরং এটি আত্মপরিচয়ের অন্যতম একটি মাধ্যম। যাদের জীবনে একটি শখ রয়েছে, তারা অন্যদের তুলনায় বেশি আত্মবিশ্বাসী, বেশি সুখী, এমনকি কাজেও তারা বেশি দক্ষ। তবে  প্রশ্ন হলো আমরা নিজের শখকে কতটুকু গুরুত্ব দিচ্ছি?

মানুষের জীবনটা একটা দৌড়ের মধ্যে দিয়ে কাটে ছোটবেলা থেকে শুরু করে চাকরি পাওয়া, সংসার গড়া, দায়িত্ব পালন করা, সবকিছুই যেন একেকটা রুটিনের খোপে বাঁধা। এই নিয়মতান্ত্রিক ছকে বন্দি জীবনে একটু ফুসরত, একটু নিজের মতো করে সময় কাটানোর সুযোগই যেন পাওয়া দায়। অথচ মানুষের মনটা তো যন্ত্র নয়। কাজ করলেই শুধু সে শান্তি পায় না, বরং ভালো থাকতে হলে প্রয়োজন মনের প্রশান্তি, প্রয়োজন এমন কিছু যা শুধু নিজের জন্য আর সেটিই হতে পারে আপনার “শখ”।

একটা মানুষ যদি সারাজীবন কেবল কাজ আর দায়িত্ব পালনেই ব্যস্ত থাকে, তাহলে ধীরে ধীরে তার জীবনের আনন্দ ফিকে হয়ে যেতে থাকে। আমরা অনেকেই নিজের ভালো লাগার জায়গাগুলোকে তুচ্ছ মনে করি, ভাবি এগুলো হয়তো সময়ের অপচয়। অথচ বাস্তবতা হলো, এই ছোট ছোট শখগুলোই আমাদের মানসিক সুস্থতা বজায় রাখে, মানসিক চাপ কমায়, জীবনের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করে।

বিজ্ঞান বলছে, যারা কোনো না কোনো শখে নিজেকে জড়িত রাখেন, তারা মানসিকভাবে অনেক বেশি স্থিতিশীল, আত্মবিশ্বাসী ও ইতিবাচক হয়ে ওঠেন। কারণ শখ মানুষকে নিজের মতো করে ভাবতে শেখায়, নিজের মতো করে সময় কাটানোর জায়গা দেয়।

Advertisements

ছোটবেলায় স্কুলে আমরা ‘আমার শখ’ রচনা লিখেছি  কেউ লিখেছি বই পড়া, কেউ গাছ লাগানো, কেউ আবার আঁকাআঁকি। তখন আমরা খুব সহজভাবে বুঝতাম, যে কাজটা করতে ভালো লাগে, সেটাই আমাদের শখ। কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনের বাস্তবতায় চাপ এতটাই বেড়ে যায় যে, নিজের সেই শখগুলোকেই ভুলে বসি।

অথচ শখ থাকা মানে নিজেকে গুরুত্ব দেওয়া। আপনি দিনে দশটা কাজ করলেন, দায়িত্ব পালন করলেন, পরিবারের পাশে থাকলেন এই সবই প্রশংসনীয়। কিন্তু নিজের জন্য একটু সময় রাখতে পারছেন কি? সেই সময়টা আপনি দিন ছবি আঁকায়, রান্নায়, লেখালেখিতে কিংবা গান শুনে—তাতেই তৈরি হবে একটুকরো নিজের পৃথিবী।

প্রত্যেক মানুষের চিন্তা, রুচি ও ভালো লাগা ভিন্ন। তাই একেকজনের শখও একেকরকম হওয়াটাই স্বাভাবিক। কেউ বই পড়েন, কেউ ফটোগ্রাফি করেন, কেউ সেলাই করেন, কেউ পুরনো ডাকটিকিট বা কয়েন সংগ্রহ করেন। আবার কেউ হয়তো লেখালেখি ভালোবাসেন, কেউ পাহাড়ে ঘুরে বেড়ানো। কোনো শখ-ই ছোট নয়, আর কোনো শখকেই তুচ্ছ করে দেখার কিছু নেই।

একজন মানুষ যদি নিয়মিত বই পড়ে, তাহলে তার জানার পরিধি বাড়ে, মন খোলে, চিন্তা গভীর হয়। একজন গাছপ্রেমী প্রতিদিন গাছে পানি দেন, আগাছা পরিষ্কার করেন এটা শুধু শখ নয়, এটা দায়িত্বশীলতারও চিহ্ন। কেউ যদি লেখেন, তবে সে অন্যের কাছে তার ভাবনা পৌঁছে দেন, আর লেখার জন্য তো প্রতিনিয়ত জানার প্রয়োজন হয়, নিজেকে আপডেট রাখতে হয়।

শখ শুধু সময় কাটানোর জন্য নয়, বরং এটি আপনার ভিতরের জগৎকে সমৃদ্ধ করে। যখন আপনি দিন শেষে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফেরেন, তখন আপনার সেই গানের চর্চা, সেই ছোট্ট বাগান, সেই ছবি আঁকার খাতা কিংবা প্রিয় উপন্যাসটিই আপনাকে আনন্দ দেয়, আপনাকে আবার নতুন করে জীবনের প্রতি উৎসাহ জোগায়।

শখ মানুষকে চুপচাপ ভালো রাখে। কারও কাছে তা থেরাপির মতো কাজ করে। যিনি গান করেন, তিনি হয়তো নিজের অভিমান, ভালোবাসা, হতাশা সবকিছু গানের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেন। যিনি রান্না ভালোবাসেন, তার কাছে প্রতিটি রান্না একেকটা শিল্পকর্ম।

শখ হলো ভালোবাসা থেকে জন্ম নেওয়া এক ধরণের টান। এটা কখনো চাপিয়ে দেওয়া যায় না। যেমন কাউকে জোর করে ভালোবাসা যায় না, তেমনি কাউকে জোর করে একটা শখে জড়ানো যায় না। নিজের ভেতর থেকে যার প্রতি ভালো লাগা কাজ করে, সেই জিনিসটাই একসময় শখ হয়ে ওঠে।

শখ মানে নিজের সঙ্গে সংযোগ রাখা, নিজের ভালো লাগাকে সম্মান জানানো। তাই অন্যের দেখাদেখি নয় আপনার শখ হোক আপনার মনের কথা শোনা, নিজের ভালোবাসা খুঁজে নেওয়া।

চাকরিজীবী হোন বা গৃহিণী, ছাত্র হোন বা ব্যবসায়ী জীবনের ব্যস্ততায় আপনি যে ক্লান্ত হয়ে পড়েন, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ক্লান্তি কাটানোর জন্য একটা ভালো লাগা দরকার। যারা কাজের ফাঁকে একটু সময় বের করে নিজের শখে মন দেন, তারাই সত্যিকারের মানসিকভাবে স্বাস্থ্যবান মানুষ।

ক্লান্ত একদিনের শেষে যদি দেখেন আপনার যত্ন করা গাছটিতে নতুন একটি ফুল ফুটেছে, অথবা আপনি একটি নতুন কবিতা শেষ করেছেন তাহলে দিনটা যতই ব্যস্ত থাকুক না কেন, মনটা কিন্তু খুশিতে ভরে উঠবে।

জীবন হোক আনন্দময়, আপনার শখের আলোয়

আপনার শখ যেটাই হোক না কেন তা যেন হয়ে ওঠে আপনার আত্মার খোরাক। সেই শখই আপনাকে নতুন দিন শুরু করতে অনুপ্রেরণা দেবে, আপনাকে জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে শেখাবে।

সুখ, প্রশান্তি ও আত্মতৃপ্তির জন্য তাই জীবনে অন্তত একটি শখ থাকা জরুরি। নিজের জন্য হলেও কিছু একটা করুন, যা কেবল আপনাকে ভালো রাখে। জীবনটা শুধু কাজের নয় জীবন মানে বাঁচার আনন্দ, আর সেই আনন্দ খুঁজে পেতে হলে শখের দরজা খোলাই সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।

Advertisements