Skip to content

২৯শে জুন, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | বুধবার | ১৫ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

আধুনিক রসায়নের জননী ম্যারি ল্যাভোসিয়ের

রসায়নচর্চায় আরবদের খ্যাতি বিশ্বজুড়ে। তবে, তাদের আলক্যামি যেন অনেকটা জাদুবিদ্যার মতো। আধুনিক রসায়ন আরও বাস্তবিক। কিন্তু আপনি কি জানতেন আধুনিক রসায়নের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে গিয়েছিলেন এক নারী?

ম্যারি এন পিঁয়েরে পঁলজ ল্যাবোসিয়ারকে আধুনিক রসায়নের জননী মনে করা হয়। তবে, এই নারীর প্রতিষ্ঠা পাওয়াটা এত সহজ ছিল না। মূলত স্বামী অ্যান্টোনি ল্যাভেসিয়ারের সহকারী হিসেবে ল্যাবর‍্যাটরিতে কাজ করতেন। ফরাসিরা নিজের ঘরকেও রোমাঞ্চকর করে তুলতে উস্তাদ। নিজের স্ত্রীর সঙ্গে মিলে বিজ্ঞানের মতো অনেকটা একঘেয়ে জায়গাতেও যে আনন্দ সঞ্চার করা যায়, তা ফরাসিরা বেশ কয়েকবার দেখিয়ে দিয়েছে।

যাহোক, ম্যারির বাবা জ্যাঁক পলজ মূলত পার্লামেন্টে একজন উকিল এবং ফিনান্সিয়ার হিসেবে কাজ করতেন। তার ব্যক্তিগত আয়ের সিংহভাগ মূলত নিজস্ব জেনারেল ফার্ম থেকে আসতো। ফিনান্সিয়ারদের এই প্রাইভেট কনসোর্টিয়াম মূলত ফরাসি অভিজাত সমাজের থেকে কিছু কিছু অংশের কর আদায়ের দায়িত্ব পেয়েছিল। বাবার সঙ্গে তাই খুব একান্ত সময় কাটানোর সুযোগ ম্যারির হয়নি। তবে ম্যারির একা একা সময় কাটানোর সুযোগও ছিল না।

মা ক্লডিন থনেট পলজ মারা যান যখন ম্যারির বয়স মাত্র তিন। সেজন্যেই ছোটবেলা থেকে পরিচারিকা সমাবৃত হয়েই তাকে বড় হতে হয়েছে। ম্যারির অবশ্য আরও দুই বড় ভাই ছিল। কিন্তু ফরাসি অভিজাত সমাজে মেয়েদের আদব-লেহাজ শিখতেই ব্যস্ত থাকতে হতো। মায়ের মৃত্যুর পর পরই তাকে লেখাপড়া শেখার জন্যে কনভেন্ট স্কুলে ভর্তি করানো হয়।

মাত্র তেরো বছর বয়সেই ম্যারির জন্যে একটি বিয়ের প্রস্তাব আসে। বিষয়টি অসঙ্গত নয় তখনকার সময় হিসেবে। কিন্তু প্রস্তাবটি ঠিক মানার মতো না। বর পঞ্চাশোর্ধ্ব কাউন্ট ডিএমারভেল। জ্যাঁক পলজ রাজি নন। কিন্তু পার্লামেন্ট থেকেই নানা হুমকি ধামকি শুরু হলো। তার চাকরি বা ফার্মটিও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

কিন্তু বাবা হয়ে কি এই বিয়ে মেনে নেয়া যায়? এই বিয়ে থামানোর জন্যে তাকে এক কূটচাল চালতে হলো। নিজের এক সহকারী অ্যান্টোনি ল্যাভেসিয়ারকে মেয়ের পাণিগ্রহণ করার অনুরোধ করেন। এই অভিজাত ভদ্রলোক একজন বিজ্ঞানীও ছিলেন। আটাশ বছর বয়স্ক অ্যান্টোনি এই অনুরোধ গ্রহণ করেন এবং ১৭৭১ সালে দুজনের বিয়ে সম্পন্ন হয়।

ম্যারি ল্যাভোসিয়ের ও তার স্বামী অ্যান্টোনি ল্যাভেসিয়ার

ল্যাভোসিয়ার শ্বশুরের ফার্মেই কাজ করতে থাকেন। ১৭৭৫ সালেই তাকে গানপাউডার অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কাজের খাতিরেই এই দম্পতিকে প্যারিসের আর্সেনালে আবাস খুঁজে নিতে হয়। এই সময়েই ভদ্রলোক রসায়নের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো দেখে মুগ্ধ হতে শুরু করেন। গিলামে ফ্রাঙ্কোইস রুলে ল্যাবর‍্যাটরিতে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর নিজস্ব ল্যাব বানানোর জন্যে তেমন ঝক্কি পোহাতে হয়নি তাকে। শ্বশুরের আর্থিক সাহায্য আর নিজের উপার্জনের ওপর ভর করেই একটি রসায়নের ল্যাব বানিয়ে নেন তিনি। এই সময়েই ম্যারি নিজেও রসায়নের কাজগুলো দেখে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। স্বামীর সঙ্গে দেখা করার ছলেই ল্যাবে চলে যেতেন যখন-তখন।

যখন তার আগ্রহ একদম স্পষ্ট, জিন ব্যাপ্টিস্ট মাইকেল বেকেট ও ফিলিপ জিনজেম্বরের মতো সহকারীরা তাকে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন। এই কজন মিলে অনেক গবেষণা করেছেন। তিনি মূলত ইংরেজি থেকে ফরাসিতে রসায়নের অনেক ডকুমেন্ট অনুবাদ করে দিতেন। ম্যারি মূলত ল্যাবর‍্যাটরি অ্যাসিস্টেন্টের ভূমিকা পালন করতেন।

ম্যারির প্রতিভা তখনো ধারালো হয়নি। তবে তিনি সব শুষে নিচ্ছিলেন। দিনে ল্যাবে নোটবুকে বিভিন্ন গবেষণার ডিজাইন স্কেচ করতেন। জ্যাক লুই ডেভিডের মতো চিত্রশিল্পীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ায় তার এই কাজে দক্ষতা বেড়েছিল। ডেভিডই তাকে ছবি আঁকার নিয়মের সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দিয়েছিলেন। তাই ম্যারি নিখুঁতভাবে স্কেচ করতে পারতেন। এজন্যেই ল্যাভোসিয়ারের অনেক সহকারী সহজেই তার গবেষণাগুলো বুঝে ফেলতে পারতেন।

এই দুজন মিলেই রসায়নের ভিত্তিপ্রস্তর নতুনভাবে সাজিয়ে নেন। তখন জর্জ হালের লজিস্টন থিওরি বেশ জনপ্রিয়। কী এই লজিস্টন থিওরি? মূলত কোনো বস্তু দগ্ধ হওয়ার সময় যে ধরনের পরিবর্তন এবং বস্তুগত বৈশিষ্ট্য দেখায় তাই ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করে এই থিওরি। ইংরেজি, ল্যাটিন ও ফ্রেঞ্চে ম্যারির দক্ষতা ছিল অসামান্য। তিনিই লজিস্টন নিয়ে অনেক কাজ ইংরেজি থেকে ফরাসিতে অনুবাদ করতেন, যেন স্বামী ভালোভাবে পড়তে পারেন।

তার অনুবাদের কাজের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো রিচার্ড কিরওয়ানের ‘এসে অন লজিস্টন অ্যান্ড দ্য কন্সটিটিউশন অব এসিডস।’ তিনি অনুবাদ করার সময় এই থিওরির অনেক ভুল বের করেন। এছাড়া জোসেফ প্রিসলি, হ্যানরি ক্যাভেন্ডিসের কাজগুলোও তিনি অনুবাদ করেন। অর্থাৎ ম্যারি নিরলসভাবে যে অনুবাদ করে গিয়েছিলেন সেগুলো থেকেই ল্যাভোসিয়ার বুঝতে পেরেছিলেন, লজিস্টনের তথ্যে অনেক ভুল আছে।

১৭৮৯ সালে ল্যাভোসিয়ার এলিমেন্টারি ট্রিটিজ অন ক্যামিস্ট্রি প্রকাশ করেন। এই কাজেই তিনি রসায়নকে একটি সমন্বিত ক্ষেত্র হিসেবে উপস্থাপন করেন। ম্যারির স্কেচ, অন্যান্য রেকর্ড দিয়ে তিনি আধুনিক রসায়নের ভিত্তপ্রস্তর নির্মাণ করেন।

ম্যারি প্রচুর পড়তেন। তার সংগ্রহেও অসংখ্য বই ছিল। স্বামীর সহকারী হিসেবে তার ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই। একথা সত্য অনেকেই তাকে একদম খাঁটি বিজ্ঞানী বলবে না। কিন্তু প্রচণ্ড মেধা ও পরিশ্রমের মাধ্যমেই তিনি সব তথ্য উপস্থাপন করেছেন, যা আধুনিক রসায়নকে দেখিয়েছে পথ।

অনন্যা/এআই