Skip to content

২৮শে জুন, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ১৪ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

অন্ধকার যেন নারীর অদৃশ্য এক শত্রু!

সমাজের নারীর শত্রুর অভাব নেই। পদে পদে নারীদের কোনো না কোনো নতুন শত্রুর মুখোমুখি হতে হয়। কিছু শত্রু দৃশ্যমান হলেও, অদৃশ্য কিছু শত্রুও রয়েছে । যেমন, অন্ধকার! নারীদের সঙ্গে অন্ধকারের যেন বরাবরই এক অদৃশ্য শত্রুতা।

হয়তো আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে এই অন্ধকারের সঙ্গে নারীর যোগসূত্র কোথায়? তবে শুনুন, এই তো বেশ কিছুদিন আগে কাজ শেষে হেঁটে হেঁটে বাসায় ফিরছিলাম। তখন ঘড়ির কাঁটায় রাত সাড়ে ১১ টা। প্রকৃতি নিয়ম মোতাবেক একইরকম থাকলেও দুটি লিঙ্গের মানুষের জন্য তখন সময়টা দুরকম। নারীদের জন্য গভীর রাত আর পুরুষদের জন্য এই তো সবে সন্ধ্যা। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই রাস্তার পাশের লাইটগুলো বন্ধ হয়ে গেলো। নাহ! কারও পরিকল্পনা নয়, লোডশেডিং। তবে ততক্ষণে আশেপাশের মানুষের পরিকল্পনা শেষ। তাদের বৃহৎ পরিকল্পনা সময় নিয়েছে বড়জোর ৩০ সেকেন্ড। অন্ধকারেও যেন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল হায়েনার মতো হিংস্র চোখ। আলো ফিরে আসতে আর বেশিক্ষণ দেরি করলে হয়তোবা সেই ভয়ঙ্কর অন্ধকারের অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে হতো চিরতরে।

এ গল্প এত বড় শহরের কোনো একটি সরু গলির। কিন্তু এমন গল্প আমাদের শহরজুড়ে প্রতিটি অলিগলিতে রয়েছে। শুধু কি বাইরেই? ঘরের ভেতরকার অন্ধকার কি নারীর জন্য নিরাপদ? তবে একটা ঘটনা বলি শুনুন, স্বামীকে বাসায় আসতে দেরি হওয়ার কারণ জানতে চাইলো রানু। বাচ্চাদের সামনে হেসে-খেলে কথা বলে আলো বন্ধ করে দিলো স্বামী আসিফ। অন্ধকারে বউয়ের চুলের গোছা ধরতে একটুও অসুবিধে হয়নি তার। অন্ধকার বরং তাকে সাহায্যই করছে। কিন্তু প্রতিনিয়ত অন্ধকার গহ্বরে হাবুডুবু খেতে খেতে রানু আজকাল অন্ধকারকে ভয় পাওয়াও ছেড়ে দিয়েছে৷

আমাদের চারপাশের প্রতিটি নারীই কখনো না কখনো সেই ভয়ঙ্কর অন্ধকারকে অনুভব করে। চারপাশের আলো নিভে গেলে আকাশের চাঁদ তারা দেখার আনন্দ উপভোগ নয় বরং তাদের একটা ভয় আঁকড়ে ধরে। অদৃশ্য কোনো হাত এসে ছুঁয়ে দেওয়ার ভয়, একটানে বিবস্ত্র করে ফেলার ভয়, চুলের গোছা ধরে আঘাত করার ভয়। তাই তো নারীদের কাছে অন্ধকার এতটা ভয়ঙ্কর!

সন্ধ্যার পরে নারীদের বাইরে থাকা যেন আমাদের সমাজে মহা-অপরাধ, আর একটা নির্দিষ্ট সময় পরে নারীদের পরতে হয় বিভিন্ন অসুবিধায়। এ কারণে অনেক ধরনের কাজের সুযোগ থেকে তারা বঞ্চিত হন। রাস্তাঘাটে বখাটে ছেলেদের থেকে শুরু করে রিকশাচালক, বাসের হেল্পার সবার কাছ থেকে হয়রানির শিকার হওয়ার পাশাপাশি উচ্চশিক্ষিত, বহু-ডিগ্রিধারী কলিগ, বস কিংবা পরিবারের বিকৃত মস্তিষ্কের কোনো সদস্য। অন্ধকারের সুযোগ নিতে ছাড়ে না কেউ।

বর্তমানে আমাদের দেশের শহরের চিত্রগুলোতে কিছুটা ভিন্নতা এলেও গ্রামাঞ্চলের চিত্র বেশ অনেকটাই করুণ। সন্ধ্যা নামার আগেই ঘরে ফেরা নারীদের জন্য একধরনের বাধ্যতামূলক কাজ৷ রাতের অন্ধকারে নারীদের বিরুদ্ধে হওয়া সব অন্যায়ের জন্য দায়ী করা হয় নারীকেই। তার দিকে ছুড়ে দেওয়া হয় একটি প্রশ্ন, ‘রাতের বেলায় মেয়েদের ঘরের বাইরে কী?’

শহুরে এলাকাগুলোতে আজকাল নারীরা অনেকটা স্বাধীনভাবে রাতের বেলা চলাফেরা করলেও তাদের নিরাপত্তায়ও রয়েছে বিশাল ঘাটতি। প্রায় প্রতি রাতেই ইভটিজিং, হয়রানি, ধর্ষণের মতো ঘটনার শিকার হতে হচ্ছে নারীদের। রাতের আঁধারে একজন নারীর উপস্থিতি টের পেলে যেন হায়েনার মতো হিংস্র হয়ে ওঠে বিকৃত মস্তিষ্কের একদল মানুষ।

রোজ গণমাধ্যমে যেসব ধর্ষণ, খুন, হয়রানির ঘটনা উঠে আসে, তার বেশিরভাগই ঘটছে রাতের বেলায়। এক্ষেত্রে প্রশাসনও যেন বরাবরই ব্যর্থতার প্রমাণ দিচ্ছে। গেলো বছরের একটি ঘটনা আলোচনায় নিয়ে আসা যাক তবে।

২০২১ সালের মে মাসের শেষের দিকে আশুলিয়া সিঅ্যান্ডবি বাইপাস সড়কে একটি বাসে গণ-ধর্ষণের শিকার হন এক তরুণী। তিনি ঘটনার দিন সন্ধ্যা হওয়ার কিছুটা পরে ‘নিউ গ্রাম বাংলা পরিবহন’ নামে একটি বাসে ওঠেন টঙ্গী যাওয়ার উদ্দেশে। পথে আশুলিয়া গরুর হাট এলাকার আগেই ওই বাসের অন্য যাত্রীদের নামিয়ে বাস আবার নবীনগরের দিকে নিয়ে যায় চালক। এরপর চলন্ত বাসের দরজা জানালা বন্ধ করে তাকে ধর্ষণ করে চালক ও হেলপারসহ অন্যরা। রাতের অন্ধকারে ঘটা এ ঘটনায় দেশজুড়ে বেশ আলোচনারও সৃষ্টি হয়। তবে বরাবরের মতো থেমেও যায় সে আলোচনা।

যুগে যুগে মশাল হাতে নারীরাই আলোর পথ দেখিয়েছে সমাজ-সংসারকে। কিন্তু বারংবার সেই নারীদেরই ভয়ের কারণ হয়েছে অন্ধকার। যেখানে চাইলেও মশাল হাতে নিতে ব্যর্থ হয়েছে তারা। অন্ধকারের অতল গহ্বরে কেউ হারিয়েছে চিরতরে, কেউ বা চালিয়ে যাচ্ছে টিকে থাকার লড়াই।

অনন্যা/ জেএজে