Skip to content

১লা ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | বৃহস্পতিবার | ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর: নারী মুক্তির অগ্রনায়ক

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালির অন্যতম একজন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (২৬ সেপ্টেম্বর ১৮২০-২৯ জুলাই১৮৯১)। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সমাজের অবহেলিত, নির্যাতিত, দুঃখী মানুষের কথা ভেবেছেন এবং আমৃত্যু সে লক্ষ্যেই কাজ করে গেছেন৷ বহুমুখী অবদানের মধ্যে বাংলা ভাষার অবদানকে ছাপিয়েও তিনি সমাজ সংস্কারক। তার অপরিসীম ও চিন্তা-চেতনার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় বাঙালি নারীদের মুক্তি ঘটে। বিধবাবিবাহ প্রচলন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, স্ত্রী জাতির শিক্ষা সবই ঈশ্বরচন্দ্রকে স্মরণীয় করে রেখেছে। অন্ধকারের আলোকযাত্রী তিনি।

বিধবাবিবাহ প্রবর্তনে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন একনিষ্ঠ সংগ্রামী চিন্তক। সমাজের কড়া রক্তচক্ষু শাসনকে উপেক্ষা করে নিজের লক্ষে অবিচল থেকেছেন। নারীমুক্তির বার্তাকে তিনি পৌঁছে দিয়েছেন সবার দ্বারে দ্বারে। বাল্যবিয়ের ফলে নারীদের অল্প বয়সে বৈধব্য গ্রহণ এবং এর জেরে অমানবিক জীবনযাপনের প্রতি আঙুল তুলেছেন ঈশ্বরচন্দ্র। তিনি ছিলেন আধুনিক মনোভাবাপন্ন। তাই মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন গোড়ায় গলদ থাকলে সমাজের কোনোই উন্নতি হবে না। আর এ সমাজের অন্যতম প্রাণভোমরা নারী। ফলে সমাজকে বদলাতে হলে, সমাজের উন্নতিকে তরান্বিত করতে হলে আগে নারীদের অবরুদ্ধ জীবনকে পরিবর্তন করতে হবে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নিয়মে নারীর জীবন চলতে থাকলে একসময় শুধু নারী নয় পুরুষও মুখ থুবড়ে পড়বে। ফলে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নেমে পড়েন সমাজ সংস্কারে। এ জন্যে তিনি বিধবা-বিবাহ চালু করা, বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ করা এবং স্ত্রীশিক্ষা বিস্তারের জন্যে আন্দোলন আরম্ভ করেছিলেন।

বিধবাদের জীবনের কষ্ট ঈশ্বরচন্দ্রকে খুবই মর্মাহত করেছিল৷ ছোট ছোট মেয়েরা বিধবা হয়ে বৈধব্য পালন করতো আর বুড়ো বয়সী হলেও পুরুষের একাধিক পত্নী গ্রহণ বিদ্যাসাগরের মনে ক্ষোভের জন্ম দেয়। সেই ক্ষোভ একসময় বিজয় ছিনিয়ে আনতে সাহায্য করে।

বীরসিংহ গ্রামে ঈশ্বরচন্দ্রের এক খেলার সঙ্গী ছিলেন। তাদের প্রতিবেশীর কন্যা। বাল্যবিয়ের শিকার খেলার সঙ্গী বিধবা হওয়ায় একাদশীর দিন তাকে উপোস করে থাকতে হতো।

কারণ বিধবাদের একাদশীতে খেতে নেই। সেই ছোট্ট বয়সে ঈশ্বরচন্দ্রের মনে প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি করে মনে। সেদিনই তিনি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন ‘যদি বেঁচে থাকি, ১৩–১৪ বছরের বিধবার এই দুঃখ দূর করবো।’

বাল্যবিয়ে রোহিতকরণ এবং বিধবাবিবাহ প্রচলনের জন্য আন্দোলন শুরু করেন৷ যদিও ওই সময় সমাজের অধিকাংশ মানুষই ঈশ্বরচন্দ্রের বিরুদ্ধে ছিল। গণস্বাক্ষরের সময় মাত্র বিধবাবিবাহের পক্ষে স্বাক্ষর ছিল মাত্র ৯৮৭ টি। পক্ষান্তরে বিধবাবিবাহের বিপক্ষে ৩৬ হাজার ৭৬৩টি। তবু একার একান্ত প্রচেষ্টা, উদ্যোগ আর হার না মানার অদম্য ইচ্ছায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সংগ্রাম চালিয়ে যান। সমাজের অতীব সুশীল ব্যক্তিরাও তার বিপক্ষে দাঁড়ান। স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্রও ঈশ্বরচন্দ্রের ঘোরবিরোধী ছিলেন। তার লেখায়ও সে প্রমাণ পাওয়া যায়। রোহিনী, কুন্দনন্দিনী তার কাছে অস্পৃশ্য! তবু জয়ের পথ নিশ্চিত করতে ঈশ্বরচন্দ্র লড়েছেন সমাজের বিরুদ্ধে। লিখেছেন ‘বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কি না এতদদ্বিষয়ক প্রস্তাব’ বই। বাল্যবিবাহ রোহিতকরণ বই। তিনি শাস্ত্রানুযায়ী যুক্তি দিয়েছেন। খণ্ডাতে চেয়েছেন সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি।

সমাজের প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর মধ্যেই ছিল তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয়। সমাজের রক্তচক্ষু কোনভাবেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে রুখতে পারেনি।

ঈশ্বরচন্দ্র যখন সংস্কৃত কলেজ থেকে পদত্যাগ করেন, তার কয়েক মাস পরে বাল্যবিধবাদের পুনর্বিবাহের পক্ষে তার প্রথম বেনামি লেখা প্রকাশিত হয় ১৮৪২ সালের এপ্রিল মাসে ‘বেঙ্গল স্পেক্টেটর’ পত্রিকায়। আর এ বিধবাবিবাহের বিষয়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রথম গ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৮৫৫ সালের জানুয়ারি মাসে। দ্বিতীয় গ্রন্থ প্রকাশিত হয় একই বছরের অক্টোবর মাসে। যার মাধ্যমে তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন বিধবাবিবাহ শাস্ত্র বহির্ভূত নয়। এটা সমাজের চাপিয়ে দেওয়া আজব নীতি।

এভাবে বিধবাবিবাহের পক্ষে শাস্ত্রীয় প্রমাণ দেওয়া ছাড়াও, বিধবাদের পুনর্বিবাহ প্রবর্তনের পক্ষে একটি আইন প্রণয়নের জন্যে তিনি সামাজিক আন্দোলন আরম্ভ করেন।

সংস্কৃত শাস্ত্রের বিরাট পণ্ডিত হয়েও পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতি গ্রহণে দ্বিধা করেননি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। নারীমুক্তি আন্দোলনেরও প্রবল সমর্থক ছিলেন তিনি। হিন্দু বিধবাদের অসহনীয় দুঃখ, তাদের প্রতি পরিবারবর্গের অন্যায়, অবিচার, অত্যাচার গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল তাকে। এই বিধবাদের মুক্তির জন্য তিনি আজীবনসর্বস্ব পণ করে সংগ্রাম করেছেন। হিন্দুশাস্ত্র উদ্ধৃত করে প্রমাণ করেছেন, যে লোকাচার ধর্মের নামে সমাজে প্রচলিত, আসলে তা ধর্মবহির্ভূত স্থবিরতার আচারমাত্র। তার আন্দোলন সফল হয়েছিল। ১৮৫৬ সালে সরকার বিধবা বিবাহ আইনসিদ্ধ ঘোষণা করেন।

তবে শুধু আইন প্রণয়নেই ক্ষান্ত থাকেননি তিনি। তার উদ্যোগে একাধিক বিধবা বিবাহের অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। এমনকি তার একমাত্র পুত্র নারায়ণচন্দ্রের সঙ্গে এক বিধবার বিয়ে দেন। এজন্য তাকে রক্ষণশীল সমাজপতিদের কঠোর বিদ্রূপের শিকার হতে হয়। বিধবাবিবাহ প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বহুবিবাহের মতো একটি কুপ্রথাকে নির্মূল করতেও আজীবন সংগ্রাম করেছেন। এছাড়া বাল্যবিবাহ প্রতিহত করতে নেন একাধিক উদ্যোগ।

শুধু বাল্যবিবাহ বন্ধ, বিধবাবিবাহের প্রচলনেই তার আন্দললন থেমে থাকেনি। তিনি নারীশিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। শুধু কলকাতায় নয়, নারীমুক্তির বার্তা বাংলার গ্রামে গ্রামে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে, বিভিন্ন জেলাতেও বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করে নারীশিক্ষার সপক্ষে জোর প্রচার চালান তিনি। যদিও তার এই উদ্যোগও সমাজের অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিত্বে দ্বারা নিন্দিত হয়। কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত পর্যন্ত অত্যন্ত হীন বাক্যবাণে নারীমুক্তি আন্দোলনের ব্যঙ্গ করেন। তবু তার জীবদ্দশাতেই নারীশিক্ষা আন্দোলন ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।

সমাজে মেয়েদের খুবই ছোট চোখে দেখা হতো। আজও যার পরিবর্তন হয়নি বললেই চলে। সমাজের কুপ্রথা আজও পর্যন্ত বয়ে বেড়াচ্ছে কিছু হীন মানসিকতা সম্পন্ন মানুষেরা। যাদের বলি হচ্ছে আমাদের সমাজের নারীরা।

বাংলায় নারীশিক্ষার প্রসারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনি ছিলেন নারীশিক্ষার বিস্তারের পথিকৃৎ। তিনি উপলব্ধি করেন যে, নারীজাতির উন্নতি না ঘটলে বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতির প্রকৃত উন্নতি সম্ভব নয়।

তাই কলকাতায় হিন্দু বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এটিই ভারতের প্রথম ভারতীয় বালিকা বিদ্যালয়। বিদ্যসাগসর ছিলেন এই বিদ্যালয়ের সম্পাদক। এটি বর্তমানে বেথুন স্কুল নামে পরিচিত।

১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে বর্ধমান জেলায় মেয়েদের জন্য তিনি একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। গ্রামাঞ্চলে নারীদের মধ্যে শিক্ষার প্রসারের উদ্দেশ্যে তিনি বাংলার বিভিন্ন জেলায় স্ত্রীশিক্ষা বিধায়নী সম্মেলনী প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিয়ে ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দে মে মাসের মধ্যে নদীয়া, বর্ধমান, হুগলী ও মেদিনীপুর জেলায় ৩৫ টি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় ১৩০০ ছাত্রী এই স্কুলগুলিতে পড়াশোনা করত। পরবর্তীকালে তিনি সরকারের কাছে ধারাবাহিক তদবির করে সরকার এই স্কুলগুলোর কিছু আর্থিক ব্যয়ভার বহন করতে রাজি হয়। ১৮৬৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলায় বালিকা বিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৮৮ টি। এরপর কলকাতায় ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন যা বর্তমানে বিদ্যাসাগর কলেজ নামে পরিচিত। এছাড়া নিজের মায়ের স্মৃতি উদ্দেশ্যে নিজ গ্রাম বীরসিংহে ভগবতী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।

সমাজের প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর মধ্যেই ছিল তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয়। সমাজের রক্তচক্ষু কোনভাবেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে রুখতে পারেনি। বাল্যবিবাহ, সতীদাহের মতো নিগৃহীত শোষন থেকে যদি বাঙালি নারীর মুক্তি মিলতে পারে তবে আজকের নারীরাও তাদের বর্তমান বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাবে। মুক্ত আকাশে ডানা মেলে ওড়ার শিক্ষা গ্রহণ করবে। তবে তার জন্য নবরূপে ঈশ্বরচন্দ্রদের আগমন ঘটতে হবে। যে শোনাবে বিজয়ের গান। ভেঙে ফেলতে পারবে সব শৃঙ্খল। যুগের চাহিদায় ঈশ্বরচন্দ্রেরা আবারও ফিরে আসুক শক্তিদায়িনী মানবরূপে।

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ