Skip to content

১লা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শনিবার | ১৬ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

নারীবিদ্বেষের শেষ কোথায়

জান্নাতুল-যূথী
জান্নাতুল-যূথী

নারীর সম্পর্কে কথা বলতে গেলে আসলে কোনোদিন কোনোকিছুর সুরাহা হবে বলে মনে হয় না। কারণটা স্পষ্ট। দেশের মানুষের মানসিকতা। নিজেদের সব বিষয়ে অতি পণ্ডিত ভাবা একশ্রেণির মানুষের কাজ। বলতে গেলে এই শ্রেণির আসলেই কোনো কাজই নেই। তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, গণমাধ্যমে কোনো সংবাদ প্রকাশের পর ইতিবাচক দৃষ্টির চেয়ে নেতিবাচক মন্তব্যই বেশি প্রকাশ করে পাশবিক আনন্দ সঞ্চার করে।

নারী মাত্রই অপমান, লাঞ্ছনা,অপদস্তের শিকার। গত ২০ আগস্ট ফিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী সানা মারিনের একটি নাচের ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় আসতেই নানারকম মন্তব্যের জেরে তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। গণমাধ্যমগুলোও নানারকম মুখরোচক হেডিং দিয়ে ভিউ-হিট বাড়িয়েছে। ফিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর নাচের ভিডিও ফাঁস। এখানে শব্দের ব্যবহারে কতিপয় গণমাধ্যমকর্মীকে সংহত হওয়া আবশ্যক ছিল। কারণ ‘ফাঁস’ শব্দের ব্যবহারের ফলে নেতিবাচক দিকেই ঈঙ্গিত প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেও একজন স্বয়ংসম্পূর্ণ মানুষ আগে। ফলে বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে আনন্দঘন মুহূর্ত শেয়ার করতেই পারেন। সেখানে এত নেতিবাচক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটা অনুচিত।

দিন গড়ালেও নারীদের সমালোচনা করার মানুষ কম নেই সমাজে। ফলে একটি ঘটনার ইতি ঘটতেই আরেকটি সামনে আসে। তেমনই একটি নতুন ঘটনা সামনে এসে হাজির। নায়িকা পূর্ণিমা রাজধানীর গ্রিন ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির ‘ফিল্ম-টেলিভিশন ও ডিজিটাল মিডিয়া’ বিভাগে অভিনয় বিষয়ে ক্লাস নেবেন বলে গণমাধ্যম খবর প্রকাশিত হয়েছে। পূর্ণিমা ছাড়াও সেখানে যোগ দিয়েছেন অভিনেতা ফেরদৌস, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, নাট্যকার আনন জামান প্রমুখ। সোশাল মিডিয়ায় খবরটি প্রকাশিত হওয়া মাত্র তার ভিড়ে মানুষের হুড়োহুড়ি বেঁধেছে, কে কত কদর্য ও করুচিপূর্ণ মন্তব্য করতে পারেন।

ফলে দক্ষতা যাদের বেশি, তারাই তো সেখানে ভালো কাজ করতে পারবেন। আর জাতিকে তো তিনি শিক্ষা দিতে আসছেন না। নির্দিষ্ট বিভাগের শিক্ষার্থীরাই সেখানে হাতে-কলমে শিক্ষা গ্রহণ করবেন।

আলোচনার সুবিধার্থে কিছু মন্তব্য উদ্ধৃত করা হলো সংবাদ মাধ্যম থেকে। ‘ভালোই হলো, এখন ছাত্ররা জানতে পারবে, বহুবিবাহ কেমনে করা যায়’; ‘ডিভোর্স শেখানোর জন্য’; ওনার ‘শিক্ষাগত যোগ্যতা জানতে চাই’; কী শিখবে জাতি তার কাছ থেকে ‘; ‘কুরুচিপূর্ণ পোশাকে কিভাবে সবার সামনে উপস্থাপন করা যায়, তাছাড়া নাইট ক্লাবে যাতায়াত অর্থ বিত্ত বড়লোক ফ্যানদের ব্লাকমেইল শিক্ষা দেবেন’। মন্তব্যগুলো এজন্যই উপস্থাপন করা, যেন পুরুষতন্ত্রের মানসিকতা স্পষ্ট হয়। কথা হলো এখানে আরও কয়েকজন অভিনেতা যুক্ত হয়েছেন, তাদের সম্পর্কে সবাই পজিটিভ। কারণ তাদের নিয়ে কারও কোনোই মন্তব্য নেই। মন্তব্য করা হয়েছে কেবল নায়িকা পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে। যে মন্তব্যগুলো করা হয়েছে, সেগুলো কোন যুক্তিতে করা হলো, তার উত্তর জানা জরুরি।

প্রথমত একজন ব্যক্তি শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হয়েছেন, সেটা হতে পারে চুক্তিভিত্তিক বা পারমানেন্ট। কিন্তু তার জন্য ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ অবশ্যই ভালো বুঝেই তাকে নিয়েছে। সেই দায়বোধ অবশ্যই তাদের। সেখানে ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে কথা না বলতে পারলে কেন নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করলো মন্তব্যকারীরা? আর বিভাগটি নিশ্চিত অর্থে ‘ফিল্ম-টেলিভিশন’ বিষয়ক। ফলে দক্ষতা যাদের বেশি, তারাই তো সেখানে ভালো কাজ করতে পারবেন। আর জাতিকে তো তিনি শিক্ষা দিতে আসছেন না। নির্দিষ্ট বিভাগের শিক্ষার্থীরাই সেখানে হাতে-কলমে শিক্ষা গ্রহণ করবেন। যোগ্যতা সম্পর্কে যদি কর্তৃপক্ষ না জানতো, তাহলে তারা তাকে অবশ্যই নিয়োগ দিতো না।

বিষয় মানসিকতার। আমাদের দেশে নারীদের দেখলেই একশ্রেণির মানুষ এতটা মুখিয়ে থাকে তা অব্যক্ত। প্রতিনিয়ত অন্যকে ছোট করে, কটূ কথা বলে নানারকম উসকানিমূলক কথা বলে সমাজের মাঝে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করাই এক শ্রেণির কাজ। ফলে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি যতদিন রুট লেভেল থেকে পরিবর্তন না হবে, ততদিন কোনাভাবেই সমাজে বেড়ে ওঠা ভাইরাস ধ্বংস হবে না।

ইতিবাচকতার চর্চা হোক। যেকোনো পর্যায়ে নারীর প্রতি শ্রদ্ধা-সম্মান গড়ে উঠুক। এই ধরনের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে নিজের আত্মাকে কলুষিত না করি আমরা। ভালোর সঙ্গে আলোর পথে চলাই হোক এই সমাজের প্রত্যেকটি মানুষের ব্রত।