Skip to content

২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

উনিশ শতকের ভারতীয় ফেমিনিস্ট অবলা বোস

প্রত্যেক সফল পুরুষের সাফল্যের পেছনে একজন নারীর অবদান আছে- এই প্রবাদটি সারা বিশ্বের মানুষের কাছেই পরিচিত। কখনো কখনো সম্মিলিতভাবে সমগ্র বিশ্বেই নিজেকে মেলে ধরতে পারেন অনেক যুগল। ঠিক পিয়েরে কুরি আর মাদাম কুরির দিকে তাকালেই বোঝা যায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে তা হয়তো জানা সম্ভব না। এমনই না জানার পাতায় অবলা বোসের নামটা আসবে।

 

আচার্য জগদীশ চন্দ্রবসুকে না চেনার কিছু নেই। স্কুলের বিজ্ঞান বই কিংবা সাধারণ বইয়ে নামটা থাকেই। কিন্তু জগদীশ বসুর অনুপ্রেরণাদাত্রী অবলা বোসের নামটা ইতিহাসের পাতায় অম্লান হয়ে থাকলেও, সর্বজনীন হয়ে উঠেনি।

 

অবলা বোসের ছিল অপার সম্ভাবনা। হয়তো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রথম বাঙালি নারী ডাক্তার হয়ে ওঠাটা খুব কঠিন কিছুই ছিল না। তবে যেহেতু তা হয়নি, এ নিয়ে আফসোসের কিছু নেই। স্বামীর সাধনার প্রধান অনুপ্রেরণাদাত্রী হিসেবেই ছিলেন। শুধু তাই না, সমাজের গঠনমূলক কাজে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন সব সময়। বিশেষত, বাঙালি নারী-শিক্ষার প্রসারে অবলা বোসের নামটি সামনে আসতে বাধ্য। নিজের কাজ দিয়ে অবলা বোস যেন নামের ঠিক বিপরীতে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তবু স্বামীর বড় পরিচয়ের আড়ালেই চাপা পড়ে গেল তাঁর নাম। অবলা বোসের বড় পরিচয় তিনি বিখ্যাত বাঙালি বিজ্ঞানী আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর স্ত্রী। অথচ তাঁর পরিচয়টুকু আরো আলাদা। সেটাই জানা যাবে বরং।

 

 

১৮৬৫ সালের ৮ আগস্ট অবলার জন্ম হয় বরিশালে। অবলার পরিবারে বেশ কয়েক পুরুষ ধরেই মেধা ও মননশীলতার চর্চা হয়ে আসছিল। তাই অবলার মানসিক গড়নে যে দৃঢ়তা এবং মেধার ছাপ স্পষ্ট হবে, তা পরিবার থেকেই যেন নির্ধারিত হয়ে উঠছিল। অবলার বাবা দুর্গামোহনের কথা বোধহয় সুনীলের উপন্যাসেই পেয়েছেন? দুর্গামোহন দাস ছিলেন ব্রাহ্ম আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা এবং সংস্কারক। শুধু বাবাই না- অবলার বোন সরলা দাস একজন শিক্ষাবিদ ছিলেন। তিনিই তো বিখ্যাত গোখেল মেমোরিয়াল স্কুলের প্রতিষ্ঠা করেন। মা ব্রহ্মময়ী দেবীই ছিলেন পুরাদস্তুর গৃহিণী।

 

বরিশালেই তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর চলে আসেন কলকাতায়। সেখানে বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয়ে কিছুদিন পড়া শেষে ভর্তি হন বেথুন স্কুলে। বেথুনে পড়ার সময়েই তিনি এক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে ছিলেন। খুব ছোটবেলা থেকেই রাজা রামমোহন রায় এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আদর্শে অনুপ্রাণিত অবলার ইচ্ছে ডাক্তার হবেন। তবে মেডিকেল কলেজে তো আর মেয়েদের পড়ার সুযোগ ছিল না। যদিও পাঁচ বছর পরেই কাদম্বিনী গাঙ্গুলী এই অচলায়তনকে ভেঙে দিবেন। তখন অবলারও সুযোগ এসেছিল। এমন না যে তিনি হতোদ্যম ছিলেন। জানতেন নিজের চেষ্টায় অধিকার প্রতিষ্ঠা হবেই।

 


 
সুযোগের অপেক্ষা না করে বরং মাদ্রাজ মেডিকেল কলেজে যাওয়া যায়। একমাত্র ওখানেই মেয়েরা মেডিকেলে পড়তে পারত। তবে বাবা দুর্গামোহনের ঘোর আপত্তি। কোথায় মাদ্রাজ! আর ওখানে থাকার জন্যে মেয়েদের হোস্টেল ছিলও না। তবে অবলার দৃঢ়তা থেকে বাবাকেও হার মানতে হয়। ব্যবস্থাও হয়ে গেল। মি. জেনসেন নামে এক অ্যাংলো ইন্ডিয়ানের বাড়িতে পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকার বন্দোবস্ত হলো। স্বপ্ন বুকে নিয়ে মাদ্রাজে যাওয়া। তবে অবলার স্বপ্ন ঠিক পূরণ হয়নি। দুই বছর মাদ্রাজে থাকার সময়ে ঘন ঘন অসুস্থ হওয়ায় ফিরে আসতে হলো লেখাপড়া শেষ না করেই। 

 

১৮৮৭ সালেই হুট করে অবলার সাথে বিয়ে হয়ে যায় জগদীশ চন্দ্র বসুর। অবলা দাস এবার অবলা বসু। নারীর ধর্ম সংসার। অবলা লেখাপড়া ছেড়ে সংসারে মনোযোগ দিলেন। এখানেই হয়তো এক মেধার পতন ধরে নেয়া যেত। কিন্তু ওইযে 'নারীর ধর্ম সংসার'!  বিয়ের পর স্বামীকে সব সময় সাহায্য করে গেছেন।

 

 

স্বামীর বিজ্ঞান সাধনায় কোনো ব্যাঘাত যাতে না ঘটে, সে-দিকে সব সময় মনোযোগ রাখতেন তিনি। মূলত জগদীশের আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না। বাবার দেনার দায় বারবার বিজ্ঞানীকে অস্বস্তিতে রাখছিল। এর মাঝে দুজনের ঘর আলো করে একটি সন্তান হয়। সে-ও কদিনের ভেতরেই অকাল মৃত্যুবরণ করে। কিন্তু এই যন্ত্রণাকেও নিজের মধ্যেই রেখেছিলেন।

 

তখন আচার্য শিক্ষকতা করতেন। জগদীশের ছাত্রদের মধ্যেই মায়ের মমতা বিলিয়ে দিয়ে শান্তি খুঁজে নিতেন। কলেজে পরানোর সময় একবার জগদীশচন্দ্র বসু তাঁর সমমর্যাদার শিক্ষকের বেতন বাড়ানোর দাবি করেন। এই দাবি কর্তৃপক্ষ ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। কয়েক মাসের বেতন আটকে রাখায় খুব সমস্যায় পড়তে হল। এমন সময়ে অবলাই ঘর সামলে রেখেছিলেন। অনেক খরচ তিনি কমিয়ে দিয়েছিলেন। তবে স্বামীর জ্ঞানসাধনায় কখনো ব্যাঘাত ঘটাতে দেননি।

 

যেহেতু নিজে বিজ্ঞানের ছাত্রী ছিলেন- তাই স্বামীকে সময় দিতে পারতেন। এমনকি বসু মন্দির প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ভুলে যাওয়া অসম্ভব। খুব সাদামাটা জীবন ছিল অবলার। সব সময় মুখে হাসি লেগে থাকতই। সংসারের বাইরেও নারী-শিক্ষার প্রসারে কাজ করে গেছেন। মেয়েদের স্কুলের গণ্ডিতে নিয়ে আসা এবং বাল্যবিবাহ বন্ধের জন্য তাঁর চেষ্টার কমতি ছিল না। তাই তো ১৯১০ সাল থেকে ১৯৩৬ পর্যন্ত ব্রাহ্ম বালিকা বিদ্যালয়ের সম্পাদিকা হিসেবে কাজ করে গিয়েছিলেন। অবলার হাতেই যেন স্কুলটি নতুন রূপ পায়। এমনকি ১৯১৯ সালেই তিনি 'নারী শিক্ষা সমিতি' গড়ে তোলেন। তাঁর এই প্রতিষ্ঠানটি বাংলায় বিশেষত গ্রামাঞ্চলে ৮৮টি প্রাথমিক স্কুল এবং ১৪টি প্রাপ্তবয়স্কদের স্কুল স্থাপন করে।

 

 

কিন্তু শিক্ষাদানের ক্ষেত্রেও যে যোগ্যতার প্রয়োজন, তা অবলা বুঝতে পেরেছিলেন। ১৯২৫ সালেই তিনি গড়ে তুললেন 'বাণিভবন ট্রেনিং স্কুল'। এখানে নারীদের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তিনি শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত করেন। এভাবে নারীর আত্মকর্মসংস্থান ও সুশিক্ষিত হওয়ার সহজ পথ বের করেন।

 

তবে শুরু করে যান এক অসীম যাত্রা, যা বঙ্গনারীদের শেখায়- সংসার নারীর ধর্ম, এবং নারীকেই গড়তে হবে নিজেকে, এই সংসারের স্বার্থে।