Skip to content

২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ১২ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

প্রথমার বঞ্চনার ইতিহাস – চন্দ্রমুখী বসু

ইতিহাসের কাজ কি? ঘটনা লিপিবদ্ধ করাই কি এর একমাত্র কাজ? ইতিহাসের পাতায় বহু মানুষের নাম লিপিবদ্ধ হয়েছে। কিন্তু যাদের নাম প্রথমে চলে আসে তাদের ক্ষেত্রে সংশোধনের আর উপায় নেই। সংশোধন সেই কাগজে কলমে মাত্র। বাস্তবে প্রথম কিংবা প্রথমার ইতিহাস সংশোধনের ব্যাপারটা ঠিক এমনই। বিশেষত নারীর ইতিহাসে এমনটা হরহামেশাই হয়। সে যাহোক, প্রথম ভারতীয় নারী গ্র্যাজুয়েটের কথা উঠলে সবার প্রথমেই কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়ের নাম সবার আগে আসবে। অথচ এই কদিন আগেই ইতিহাসের পাতায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। কাদম্বিনীর নামের সাথে যুগ্মভাবে আসবে আরেকটি নাম – চন্দ্রমুখী বসু। ভুরু কুচকে তাকাতেই পারেন। অবাক হতেই পারেন অনেকেই। কিন্তু হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতার সাথে যাদের একটু আধটু পরিচয় আছে তারা হয়তো চিনে ফেলবেন সহজেই। হ্যাঁ, ঐযে কবিতাটি:

 

"হরিণ নয়না শুন কাদম্বিনী বালা,
শুনো ওগো চন্দ্রমুখী কৌমুদীর মালা।
বেঁচে থাক, সুখে থাক চিরসুখে আর।
কে বলে রে বাঙ্গালীর জীবন অসার?"

 

অদ্ভুত ব্যাপার হলো বাংলার এমনকি ভারতের ইতিহাসের এই মহামান্য নারী নিজের কোনো আত্মস্মৃতি লিখেননি। বেথুন কলেজের প্রথম মহিলা অধ্যক্ষ চন্দ্রমুখী বসু খুব অল্প বয়সেই অবসর নিয়ে চলে গেলেন দেরাদুনে। সেখানেই কাটালেন ত্রিশটি বছর। অথচ নিজের ব্যাপারে একটি অক্ষর তো অন্তত লিখতে পারতেন। নিজের সংগ্রাম নিয়ে কিছুটা জানালেও হতো। তা নিয়ে আক্ষেপ আছে অনেকেরই। অথচ তার কৃতিত্বগুলোকে কি এত সহজে ভুলে যাওয়া যাবে? সেদিকেই একটু নজর ফেরানো যাক এবার। 

 

১৮৬০ সালেই অধুনা বাংলাদেশেই চন্দ্রমুখীর জন্ম। চন্দ্রমুখীর বাবা ভুবনমোহন বসু সময়ের থেকে কিছুটা এগিয়ে ছিলেন। তিনি হিন্দুধর্মের গোঁড়ামি দেখে বিরক্ত হয়েছিলেন। তাই দ্রুতই খ্রিস্টধর্মের দীক্ষা নেন। তবে বাংলাদেশে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের সমস্যা দেখে তিনি দেরাদুনে সপরিবারে স্থানান্তরিত হন। সেখানে মিশনারিদের কাছেই কাদম্বিনী প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। অন্তত শুরুতে কোনো সমস্যাই ছিলোনা। তার সম্ভাবনাও নেহাত কম। সমস্যা শুরু হয় এফএ পরীক্ষা দেওয়ার আগে কলকাতায় আসার পর। তখন বেথুন কলেজ ছাড়া আর কোথাও পড়ার কথা ভাবাটা একটু মুশকিলই বলা চলে। একই সময়ে কাদম্বিনী নিজেও একইসাথে কলকাতায় আসেন। হিসেব অনুসারে কাদম্বিনী আর চন্দ্রমুখীর সহপাঠী হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে নিশ্চিতই বলা যায়।

 

কিন্তু ইতিহাসের অলিগলি একটু অদ্ভুতই বটে। চন্দ্রমুখী কোনোমতেই বেথুনে ভর্তি হতে পারলেন না। কেন? কারণ বেথুন কলেজের কার্যনির্বাহী কমিটির একটা নিয়ম ছিলো। বেথুনে মিশনারি স্কুলের মেয়েদের ভর্তি করানো যাবেনা। ভারতীয় মেয়েদের শিক্ষার প্রবাদতম প্রতিষ্ঠান এই বেথুনেই লেখাপড়ার সুযোগ হলোনা এই ভারতীয় মেয়ের। কি আর করার? ফিরে গেলেন দেরাদুনে। দেরাদুনে মিশনারি ছাত্রীদের জন্যে নির্ধারিত ফ্রি নর্মাল স্কুলেই পড়তে হলো তাকে। অবলা দাশ, কাদম্বিনী বা সরলার সাথে একসাথে পড়া হলোনা চন্দ্রমুখীর।

 

সেই দেরাদুনেই নিজের মতো করে পড়ে গেলেন। এফএ পরীক্ষাটাও দিলেন কোনোরকম ঝামেলা ছাড়াই। আর এবার কি বাকি রইলো? আইএ পরীক্ষা দিবেন। সেজন্যে একটি চিঠি লিখলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বরাবর। এই চিঠিতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ হৈচৈ শুরু হয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুইদিন ধরে সিন্ডিকেট মিটিং এ নিয়ে আলোচনা চলে। ২৫ নভেম্বরে শুরু হওয়া মিটিং এ একটিই বিষয়- পরীক্ষার্থীদের বিজ্ঞপ্তিতে তখন মেয়েদের নাম প্রকাশ করার চল হয়নি। এই মেয়েকে পরীক্ষা দেয়ার যথেষ্ট কারণ থাকলেও নিয়মের জন্যেই করা যাচ্ছেনা। কিন্তু চন্দ্রমুখীর আগ্রহ দেখে আর কিছু করা গেলোনা।

 

পরীক্ষায় বসলেন। ইংরেজি, লজিক, ল্যাটিনে বেশ ভালো নম্বর নিয়ে পাশ করলেন। পরীক্ষায় যা নাম্বার পেলেন তা নিয়ে একজন পুরুষ পরীক্ষার্থীও পাশ করতে পারতেন কিনা সন্দেহ আছে। অথচ নিয়মের ফাঁক বলে একটা কথা তো থাকেই। পাশ করার তালিকায় নেই চন্দ্রমুখীর নাম। শুধু আছে ''অল পার্সন পাসড"। প্রশ্ন হলো নারী কি আর পার্সন? ঠিক তিন বছর পর ১৮৭৯ সালেই শুরু হয় আন্দোলন। এতেই কাজ হয়। ১৮৮৩ সালে আমরা পাই প্রথম নারী গ্র্যাজুয়েট কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়কে। অথচ চার বছর আগেই এই খেতাব পেতেন চন্দ্রমুখী বসু। প্রথমবারের সাফল্য তাকে দেয়া হবেনা। পরে আবার আবেদন করা হলে এমনটাই জানানো হয়।

 

চন্দ্রমুখী এমএ পড়বেন। এভাবেই ব্রিটিশ ভারতে প্রথম নারী হিসেবে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন চন্দ্রমুখী। ২০১০ সালে চন্দ্রমুখীর ১৫০ জন্মবার্ষিকীতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন উল্লেখ্য করেই সুনন্দা দেবী প্রমাণ করেন চন্দ্রমুখীর সাথে অন্যায় হয়েছিলো। এই অন্যায় ২০১৩ সালে কলকাতা কলেজের উপাচার্য সুরঞ্জন দাস স্বীকার করেন এবং বেথুন কলেজের হাতে তার এন্ট্রান্সের সার্টিফিকেট তুলে দেন। ততদিনে ইতিহাস লেখাই আছে।

 

কাদম্বিনী বেথুনের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন। এমনকি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রথম নারী হিসেবে তিনি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ হন। বেথুনে তিনি অনেক সংস্কার করতে চেয়েছিলেন। এজন্যে পত্রিকায় বহুবার কটাক্ষ এবং সমালোচনার স্বীকার হয়েছেন। কলেজের মেয়েদের টেনিস, ব্যাডমিন্টন খেলার জন্য বাড়তি পোশাক ও জুতো চেয়ে নির্দেশিকা জারি করায় গোঁড়া হিন্দু সমাজের কটাক্ষ সহ্য করেছেন। তবে ১৮৯০ সালেই তিনি এর কড়া জবাব দেন ইন্ডিয়া মিররে। ব্রিটিশ সরকারের কাছে বহুবার চিঠি পাঠিয়ে বাড়তি ফান্ড জোগাড় করেছেন। মোটে ৪১ বছরের জীবনে পরিশ্রম করেন অনেক। আর পরেই স্বেচ্ছায় অবসর নেন। ফিরে যান দেরাদুনে। রেখে যান রহস্য। এই বঞ্চনা সহ্য করেও নিজের মতো কাজ করে গিয়েছিলেন। অথচ ইতিহাস হয়তো এই প্রথমাকে অন্যভাবে দেখতে পারতো। সংশোধন কিই বা করতে পারে।