অনন্যা সাহিত্য পুরষ্কার পাচ্ছেন লেখক নাদিরা মজুমদার

নাদিরা মজুমদার
নাদিরা মজুমদার
‘অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার ১৪২৬’ অর্জন করেছেন বাংলাদেশের অন্যতম অগ্রগণ্য বিজ্ঞানবিষয়ক লেখক নাদিরা মজুমদার। ২৯ ডিসেম্বর ২০১৯, রবিবার বিকেলে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর হাতে এই পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।'

নাদিরা অনেক বছর ধরে চেক প্রজাতন্ত্রে বসবাস করছেন। জন্ম ১৯৫৩ সালের ১ মে ঢাকায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থ বিজ্ঞানে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করে বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে তিনি ছিলেন অ্যাকাউন্ট্যান্ট, কম্পিউটার প্রোগ্রামার, ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজার, চেক প্রজাতন্ত্রের নীতিনির্ধারক ইত্যাদি। ছিলেন জাতিসংঘের উদ্বাস্তু কমিশনের বহিরাগত কনসালট্যান্ট। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে :‘এই আমাদের পৃথিবী’, ‘একমেরু বনাম বহুমেরু’, ‘মহাবিশ্বে আমরাও আছি’, ‘বিমান’, ‘কৃত্রিম উপগ্রহ’, ‘আগ্নেয়গিরি ও ভূমিকম্পের কাহিনি’, ‘নানারঙের বিজ্ঞান’, ‘আইনস্টাইন সুপারস্টার’, ‘সময়, তুমি কে?’ ইত্যাদি।

তাঁর জীবন, কর্ম, স্বীকৃতি ইত্যাদি ঘিরে সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন মোজাফ্ফর হোসেন.

আপনি কবে থেকে লেখালেখি শুরু করলেন?

না.ম. : সে অনেক বছর আগে। স্কুলে দেয়াল পত্রিকা বের করার রেওয়াজ ছিল। ক্লাসের ফার্স্ট গার্লকে লিখতেই হবে এমন কারণে লিখেছি। আমি পড়তাম বাংলাবাজার গার্লস স্কুলে, আমাদের শিক্ষকরা আন্তরিকতার সঙ্গে বুদ্ধি-পরামর্শ দিতেন। বকসিবাজার কলেজে পড়ার সময় কলেজের একটা ম্যাগাজিনে কিছু ছাপা হয়েছিল, বিষয়বস্তু মনে নেই। সত্যিকার অর্থে লেখালেখি শুরু হয় ‘সাপ্তাহিক বেগম’ পত্রিকায়, সপ্তাহে একটি করে (সম্মানীর বিনিময়ে) প্রতিবেদন লেখা দিয়ে। ইন্টারমিডিয়েটের শেষবর্ষ থেকে।

সকলে যেখানে সৃজনশীল সাহিত্যে লেখালেখি করতে চান, আপনি শুরুটাও সেভাবে করেছেন, কিন্তু শেষপর্যন্ত বিজ্ঞান ও বৈশ্বিক রাজনীতির মতো ‘কঠিন’ বিষয় নিয়ে লেখালেখির বিশেষ কারণ আছে কি?

না.ম. : আপনার প্রশ্নের ‘সৃজনশীল’ শব্দ শুনে খুশি খুশি ভাব হতে না হতেই ‘কঠিন’ বিষয়ের কথা বলে আমার খুশির বেলুনটিকে কেমন চুপসে দিলেন! সিরিয়াসলি বলি, কচি-কাঁচার মেলার দাদাভাইয়ের সঙ্গে দেখা হওয়াটা ছিল এর পেছনে বড়ো ঘটনা। তিনি নানাভাবে যুক্তি দিয়ে আমাকে বোঝান যে, গল্প, কবিতা, উপন্যাস লেখার অনেক লোক রয়েছে, ওপথে গিয়ে ভিড় বৃদ্ধির দরকার কী? বিজ্ঞানবিষয়ে সরল ভাষায় লেখালেখি করাটাই উত্তম। এক সন্ধ্যায় ড. আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দীনের বাসায়ও নিয়ে যান দাদাভাই। দুই সুপার ব্যক্তিত্বের ‘টার্বো ব্রেনস্টর্ম’ আমাকে নন-ফিকশনধর্মী বিজ্ঞান লেখার পথে নিয়ে আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে, আমার শিক্ষক ড. মুহাম্মদ ইব্রাহীম হরহামেশাই বিবিধ সৃজনশীলতা নিয়ে নেশার মতো ব্যতিব্যস্ত থাকতেন (এখনো থাকেন), তাঁর অনেক সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আমিও যুক্ত ছিলাম। আর বৈশ্বিক রাজনীতি কঠিন? আসলে কি তা-ই! বিশ্ব-রাজনীতি হলো ‘গ্র্যান্ড চেস-বোর্ড’, কয়েকশ বছরের লেনদেনের হিসাব-নিকাশের দাবার বোর্ড, থিয়েটার। প্রতিটি চালের ‘জাস্টিফাই’ করার কসরত দেখার মতো! বিভিন্ন ঘটনার বিকাশপর্বগুলোকে অনুসরণ করে যাবেন, দেখবেন যে বৈশ্বিক রাজনীতি আসলে ভিন্নমাত্রার গল্প-উপন্যাস-কবিতা বা এমনকি মহাকাব্য! বাংলায় চলমান বৈশ্বিক রাজনীতি নিয়েও লেখালেখির পরিমাণ বেশি নয়, দেখে ভাবলাম, লিখি না কেন? শুরু করলাম। পাঠক সুন্দরভাবে গ্রহণ করেছেন।

আপনি বিজ্ঞানের ছাত্র হয়ে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হলেন। সাপ্তাহিক রোববারে লেখালেখি শুরু করলেন। এও শুনেছি, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নারী ‘ইনভেস্টিগেটিভ’ স্টাফ রিপোর্টার আপনি। আবার আপনিই ১৯৮১ সালে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো কোনো পত্রিকায় বিজ্ঞানবিষয়ক ফিচার পাতা চালু করেন। এরকম সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়া কীভাবে সম্ভব হলো?

না.ম. : সাপ্তাহিক রোববার সবেমাত্র ভূমিষ্ঠ হয়েছে। একদিন ইত্তেফাক ভবনে যাই (সাপ্তাহিক রোববারের অফিসটি এই ভবনের তিনতলায় ছিল)। সেদিন বিকেলের দিকে মেজর জলিল, গোলাম মোস্তফা, খন্দকার মোশতাক আহমেদসহ কাকে কাকে যেন জেলখানামুক্ত করা হয়। যে মুহূর্তে আমি রাহাত খানের ছোট্ট ঘরের দরজা খুলে গলা ঢুকিয়ে দিয়েছি, ঠিক সে সময়ে খবরটি রেডিওতে প্রচার হচ্ছিল। রাহাত খান ইশারায় ভেতরে ডেকে বসালেন এবং ‘মুখবন্ধ’ ছাড়া বললেন যে, জেলছাড়া নেতাদের ফার্স্টহ্যান্ড স্কুপ ইন্টারভিউ করতে হবে, পরশুদিন রোববার যে সংখ্যা বেরোচ্ছে সেখানে থাকবে। নামিদামি সাংবাদিকদের ভিড়ে কে আমাকে চান্স দেবে, বলুন? কেউ না। রাজনীতিও তো তেমন বুঝি না! রাহাত খান আমাকে পাত্তাই দিলেন না, দিলেন নাতিদীর্ঘ ব্রিফিং। ফলে বাধ্য হয়ে আমাকে ফার্স্টহ্যান্ড স্কুপ ইন্টারভিউ করতে হয়েছিল। কয়েকদিন বাদে, একুশের বইমেলায় রাহাত খানের সঙ্গে দেখা হতেই বললেন, সাংবাদিকতা করবেন সাপ্তাহিক রোববারে? কালকে দেখা করুন। দেখা করলাম, স্টাফ রিপোর্টারের চাকরিটা হয়ে গেল। এরমধ্যে একদিন নিয়মিত ‘বিজ্ঞান-পাতা’ চালুর প্রস্তাব করলাম, রাহাত খান ও কবি রফিক আজাদ সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলেন। আমার বিজ্ঞান-পাতার সাফল্যের ভাগিদার তাঁরাও কিন্তু। তখন সাপ্তাহিক রোববারের কভার স্টোরি করতে অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিকতা করতে হয়েছে।

যে-সময় মেয়েদের জন্য পত্রিকায় কাজ করা সহজ ছিল না। বিজ্ঞান এবং রাজনীতি বিষয়ে কোনো নারী লেখক ছিলেন কি না, জানি না। আজও সেই অর্থে এই বিষয়ে নারী লেখকের সংখ্যা অপ্রতুল। আপনি এই চ্যালেঞ্জটা কি সচেতনভাবে নিয়েছেন?

না.ম. : রোববারের বিজ্ঞান-পাতা বিজ্ঞানকে মূলধারার মিডিয়ায় নিয়ে আসে, ঠিকই বলেছেন। বাংলা ভাষায় বৈশ্বিক রাজনীতি নিয়ে লেখালেখির প্রসঙ্গে বলতে গেলে দেখবেন যে, পুরুষ লেখকের সংখ্যাও কিন্তু কম। পেশাগত জীবনে চেক প্রজাতন্ত্রের নীতি-নির্ধারকের দায়িত্বপালনের সময় আমার মূল অ্যাজেন্ডা ছিল ইইউ। পেশাগত সূত্র আমাকে পূর্বোল্লিখিত ‘গ্র্যান্ড চেস-বোর্ড’ রূপকথার মতো আকর্ষণ করে।

আপনি যখন ধারাবাহিক বিজ্ঞানের নানা বিষয় নিয়ে লিখছেন, তখন আপনার লেখার জন্য পাঠক অপেক্ষা করতেন। আপনার লেখা পড়ার জন্যই পত্রিকা কিনতেন, এমন কথাও শুনেছি। আপনি নিজে প্রত্যক্ষভাবে কী ধরনের সাড়া পেয়েছেন?

না.ম. : আসলে, পাঠকের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়াই ‘বিজ্ঞান-পাতাটি’কে টিকিয়ে রাখে। তাদের চাওয়াতে বিজ্ঞান-পাতার সীমিত পরিসর ছাড়িয়ে রোববারে কভার স্টোরির মর্যাদা পায় বিজ্ঞান। পাঠকের চাহিদার একটি উদাহরণ দিই। ১৯৮১ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মজয়ন্তী উত্সবের প্রধান অতিথি ছিলেন পদার্থবিদ্যায় নোবেল বিজয়ী প্রফেসর আব্দুস সালাম। তাঁর সঙ্গে চিঠিপত্রের মাধ্যমে পূর্ব থেকেই পরিচয় ছিল আমার। রোববারের সম্পাদনার মূল দায়িত্ব ছিল কবি রফিক আজাদের। তিনি সালামের ঢাকা-ভ্রমণকে প্রজেক্ট হিসেবে তিনভাগে ভাগ করেন, ঢাকা আগমনের সপ্তাহ দুই পূর্বে প্রফেসর সালামের বিষয়ে ‘মুখবন্ধ টাইপ’ আমার একটি বড়োসড়ো প্রতিবেদন রোববারে প্রকাশিত হয়, প্রফেসরের ঢাকায় আগমনের পরে আসে ‘এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউ’ সমেত কভার-স্টোরি পর্ব, এবং ফলো-আপ দিয়ে সমাপ্তি। পাঠক সমাজ এই প্রজেক্টটিকে বেশ ভালোভাবে গ্রহণ করেন।

বড়োদের পাশাপাশি ছোটদের জন্যও আপনি বিজ্ঞানবিষয়ক চমত্কার কিছু বই লিখেছেন। পাঠকের দিক থেকে কেমন সাড়া ছিল?

না.ম. : আমার প্রথম বই শিশু একাডেমির জন্য লেখা ‘এই আমাদের পৃথিবী’। বইটি সব বয়সী পাঠক লুফে নিয়েছিল, এর একাধিক সংস্করণও বের হয়। এমনকি বাংলাদেশস্থ জাতিসংঘের ইউনিসেফ তাদের এক প্রজেক্টের অধীনে দুটো সংস্করণ করেছিল। ‘আগ্নেয়গিরি ও ভূমিকম্পের কাহিনি’ বইটিও সব বয়সের পাঠকের কাছে সমাদৃত হয়েছে। শিশু একাডেমি ‘সময় আসলে কী?’ নামে শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা আমার একটি বই ছাপছে। আমাদের পৃথিবীর সময়ের হিসাব-নিকাশ করার পদ্ধতি নিয়ে লেখা। আশা করি, এই বইটিও সকল বয়সীদের ভালো লাগবে।

আপনার বিজ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থগুলোও সুখপাঠ্য। এখানে সাহিত্যও আছে। বিজ্ঞানের মতো বিষয় এমন চমত্কার করে উপস্থাপন করার পেছনে কোনো কারণ আছে? নাকি এটা আপনার স্টাইল?

না.ম. : বাংলা উপন্যাস, কবিতার পাশাপাশি শুয়েবসে আয়েশি কায়দায় বাংলায় বিজ্ঞানবিষয়ক জনপ্রিয় লেখা সমানতালে বিকশিত হয়নি। বিজ্ঞানকে অজানা কারণে এমন এক সিরিয়াস রাজ্যভুক্ত করা হয় যেনবা তার প্রকাশ চিরায়ত সহজবোধ্য ভাষায় লেখা ঠিক হবে না। গল্প-উপন্যাস কবিতায় যে বাংলা ব্যবহূত হয়—যেন বিজ্ঞান প্রকাশে সেটি হওয়া ঠিক হবে না। ফলে, জনগণের জন্য নির্ধারিত পত্রপত্রিকায় স্পোর্টস, সংস্কৃতি/সিনেমা, সাহিত্য, রান্নাবান্না ইত্যাদির পাশাপাশি জনপ্রিয় ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার প্রচলন গড়ে ওঠেনি। কিন্তু আমার মতো করে সহজ ভাষায় আমি যেভাবে বুঝি, সেভাবে লেখার চেষ্টা করি। বলতে পারেন যে, আমার স্টাইলে আমি লিখি।

আপনি অনুবাদ করেছেন খ্যাতিমান ভারত-বিশারদ দুশান জ্বাভিতেলের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা চেক ভাষার বই। বাংলাদেশের কোনো বই চেক ভাষায় বা চেক ভাষার আর কোনো বই বাংলা ভাষায় অনুবাদের পরিকল্পনা আছে কি? এই দুটি ভাষার মধ্যে সাহিত্যিক বিনিময় নেই বললেই চলে। এটা কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায় বলে আপনি মনে করেন?

না.ম. : ভারত-বিশারদ দুশান জ্বাভিতেলকে অনেক অনেক বছর ধরে চেনাজানার সুযোগ আমার হয়েছিল। তাঁর সম্পর্কে কিছু কিছু আমি লিখেছিও। ছিলেন চেক দেশের নাগরিক, মনেপ্রাণে ছিলেন বাঙালি। তাঁর শিক্ষক প্রফেসর ভিনসেন্স লেসনি ও রবীন্দ্রনাথের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব ছিল। তিনি সরাসরি বাংলা থেকে রবীন্দ্রনাথের চেক অনুবাদ করেন এবং দুশান সেই ঐতিহ্য অব্যাহত রাখেন। মৈমনসিংহ গীতিকাকে তিনি বিশ্বসাহিত্যের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ওপরে চেক ভাষায় চমত্কার একটি বই লেখেন, ‘বাংলাদেশ : রাষ্ট্র যার জন্ম ছিল অনিবার্য’। বইটির অনুবাদ করেছি। দুশান আমাকে বলেছিলেন, ‘বাংলা আমার সারাজীবনের ভালোবাসা।’ আমি কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ একমাত্র দেশ, যার রাষ্ট্রভাষা বাংলা। বাংলা আমার সারাজীবনের ভালোবাসা।’

লেখালেখির বাইরে একটা প্রশ্ন করতে চাই। সত্তরের শেষদিকে এবং আশির দশকে আপনি ঢাকায় আলোচিত হন সাহসী এবং আধুনিক লাইফস্টাইলের কারণে। বিশেষ করে তখন একজন নারীর নির্দিষ্ট ছকের বাইরে বের হওয়া কঠিন ছিল। খাবার, পোশাক, চলাফেরা, এর মধ্যে পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে মেলামেশার ব্যাপারটাও আছে। তাছাড়া কত সময় বাসার বাইরে থাকবে, এসব বিষয়ে একটা ‘নিয়মশৃঙ্খলা’ ছিল। এখনো আছে। আপনি সেই সময়েই এই বাঁধাধরা ছকের বাইরে এলেন। নারীদের প্রচলিত সামাজিক মিথ ভেঙে এগিয়ে যান। এটা নিয়ে জানতে চাচ্ছি।

না.ম. : সাহসী, আধুনিক লাইফস্টাইল ইত্যাদি? হয়তো তা-ই, বাস্তবিকই তা-ই। তবে আমাদের পরিবারে ‘পূর্ব নির্দিষ্ট ছক’ অনুযায়ী ছেলে ও মেয়ের মধ্যে পার্থক্যকরণ ও প্রিভিলেজের ব্যবহার হয়নি। আমাদের পারিবারিক জীবনযাত্রার প্রণালির সঙ্গে ব্যারাকজীবনের কিছুটা মিল রয়েছে। সকালে সূর্য ওঠার আগে বিছানা ছাড়া, সূর্য ডোবার পূর্বে বাড়ি ঢোকা, সকাল, দুপুর, রাতের খাবার বেঁধে দেওয়া, সময়মতো খাওয়া, সন্ধ্যা দশটার মধ্যে ঘুমোতে যাওয়া ইত্যাদি হরেক রেগুলেশনের মধ্যে ক্লাস টেন পর্যন্ত কেটেছে। ‘সাউন্ড অব মিউজিক’ দেখেছেন? ক্যাপ্টেন ফন ট্র্যাপের স্থলে আমার বাবাকে কল্পনা করে নিন। তদুপরি, ষাটের দশক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দশক একটি। প্রতিবাদের দশক। বাঙালির জীবনে ষাটের দশক অত্যন্ত ঘটনাবহুল—ছয়দফার দাবি, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, বিক্ষোভ মিছিল এবং আমরা সমস্ত পরিবার এসবে শরিক হই। ষাটের দশকের দ্বিতীয়ার্ধ্ব থেকে স্কুলছাত্রী আমি মিছিল-বিক্ষোভে গেছি। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ষাটের দশকে দুই কেনেডি খুন হলেন, মার্টিন লুথার কিংও তা-ই, চলছে রক্তাক্ত ভিয়েতনাম যুদ্ধ, হিপ্পি মুভমেন্ট এবং মনোহরণ করা মেলোডি বা সুর ইত্যাদি আমার প্রজন্মকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে। মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যার মতো ঘটনার কারণে টিনএজ অধ্যায়ের স্বাভাবিক সমাপ্তি ঘটার সময় আমরা পাইনি, আমার প্রজন্ম দুমদাম ‘প্রাপ্তবয়স্ক’ শ্রেণিতে পরিণত হয়।

অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার পাচ্ছেন। অভিনন্দন আপনাকে। এতদিন মূলধারার সাহিত্য ও গবেষণার মানুষেরা এই পুরস্কার পেলেও, এই প্রথম কোনো বিজ্ঞানবিষয়ক লেখক এটা পেতে যাচ্ছেন, আপনার অনুভূতি জানতে চাই।

না.ম. : পুরস্কার পাওয়ার বিষয়টি আনন্দজনক। অনন্যা সাহিত্য পুরস্কারের মতো বড়ো মাপের পুরস্কার একদিন পাব—ভাবিনি কোনোদিন। না-ভাবা জিনিস পাওয়ার আনন্দ যে কত গভীর, ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। অনন্যা সাহিত্য পুরস্কারের ইতিহাস যা জানি, তা থেকে বলছি, গত ছাব্বিশ-সাতাশ বছর ধরে অনন্যা তার অনন্যতার যথার্থতা বজায় রেখেছে। প্রমাণ? আমি স্বয়ং। আমাকে পুরস্কৃত করার মাধ্যমে অনন্যা কথিত বিশুদ্ধ সাহিত্য ও গবেষণার ছকে বাঁধা স্পেসটিকে সম্প্রসারিত করেছে। ‘বিকল্প সাহিত্য’ নামক অস্তিত্ব মাত্র জন্মগ্রহণ করল। কী চমত্কার এক মুহূর্তের সাক্ষী আমরা! অভিনন্দন ও করতালি অনন্যার নিউক্লিয়াস তাসমিমা হোসেনের প্রাপ্য।

সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক