ভূত চতুর্দশীতে দেখতে পারেন পশ্চিমবঙ্গের ১০টি ভূতের সিনেমা

ভূতপ্রেম বাঙালির বহু পুরোনো। ঠাকুরদা-ঠাকুমার মুখে শোনা শাঁকচুন্নি, পেত্নী, ব্রহ্মদৈত্য কিংবা মেছোভূতের গল্পের প্রতি আকর্ষণ আজও কমেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সেই ভূতেরা জায়গা করে নিয়েছে বাংলা সিনেমার পর্দায়। কখনো তারা ভয় দেখিয়েছে, কখনো হাসিয়েছে, আবার কখনো মানুষের জীবনের নানা অদ্ভুত রহস্যের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে। ভূত চতুর্দশী মানেই অন্ধকার রাত, প্রদীপের আলো আর ভূতেদের নিয়ে নানা গল্প। এই বিশেষ দিনে তাই ঘর অন্ধকার করে দেখে ফেলতে পারেন পশ্চিমবঙ্গের বাংলা চলচ্চিত্র জগতের ১০টি উল্লেখযোগ্য ভূত ও অতিপ্রাকৃত কাহিনিনির্ভর সিনেমা। এই তালিকায় রয়েছে বাংলা সিনেমার পুরোনো দিনের ক্লাসিক থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ের জনপ্রিয় হরর-কমেডি।
যমালয়ে জীবন্ত মানুষ
ভূত চতুর্দশীর তালিকা শুরু হোক বাংলা সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় ফ্যান্টাসি-কমেডি ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’ দিয়ে। ১৯৫৮ সালে মুক্তি পাওয়া প্রফুল্ল চক্রবর্তী পরিচালিত এই ছবিতে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয় আজও দর্শকদের মুগ্ধ করে। জীবন্ত মানুষের যমালয়ে পৌঁছে যাওয়া এবং সেখানকার বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা নিয়ে এগিয়েছে ছবির গল্প। যমরাজের দরবার, স্বর্গ-নরকের পরিবেশ আর হাস্যরসের মিশেল ছবিটিকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা। নিখাদ ভূতের সিনেমা না হলেও অতিপ্রাকৃত আবহের জন্য এই তালিকায় ছবিটির জায়গা প্রাপ্য।
কঙ্কাল
বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম দিককার পূর্ণদৈর্ঘ্য ভৌতিক সিনেমাগুলোর মধ্যে নরেশ মিত্র পরিচালিত ‘কঙ্কাল’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৫০ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটির গল্পে রয়েছে প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা, হত্যা এবং মৃত্যুর পর প্রতিশোধ নেওয়ার ভয়ংকর আখ্যান। একটি কঙ্কালকে ঘিরে তৈরি হয় রহস্য ও আতঙ্কের পরিবেশ। সাদা-কালো পর্দায় সেই সময়ের সীমিত প্রযুক্তি ব্যবহার করেও কীভাবে ভৌতিক আবহ তৈরি করা যায়, তার একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ এই সিনেমা।
মণিহারা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প অবলম্বনে সত্যজিৎ রায়ের নির্মিত ‘মণিহারা’ বাংলা সিনেমার অন্যতম সেরা ভৌতিক গল্প। গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গয়নার প্রতি অসম্ভব আসক্ত এক জমিদারপত্নী মণিমালিকা। গয়নার প্রতি ভালোবাসা, স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং রহস্যজনক অন্তর্ধান মিলিয়ে গল্পটি ক্রমশ হয়ে ওঠে গা ছমছমে। বিশেষ করে ছবির শেষাংশ দর্শকের মনে দীর্ঘক্ষণ অস্বস্তি ও রহস্যের অনুভূতি জাগিয়ে রাখে।

নিশি তৃষ্ণা
বাংলা হরর সিনেমার তালিকায় পরিমল ভট্টাচার্য পরিচালিত ‘নিশি তৃষ্ণা’ একটি উল্লেখযোগ্য নাম। এই ছবিতে উঠে এসেছে বাংলার লোকবিশ্বাসে প্রচলিত রক্তপিশাচের ধারণা। গ্রামবাংলার পরিবেশ, অন্ধকার, অজানা আতঙ্ক এবং রক্তপিপাসু অতিপ্রাকৃত সত্তার উপস্থিতি ছবিটিকে দিয়েছে ভিন্ন স্বাদ। যারা প্রচলিত ভূতের গল্পের বাইরে একটু বেশি গা ছমছমে অভিজ্ঞতা খুঁজছেন, তাদের জন্য ছবিটি হতে পারে ভালো পছন্দ।
ভূতের ভবিষ্যৎ
বাংলা ভূতের সিনেমার কথা উঠলে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর নাম আসবেই। ২০১২ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবিতে একটি পুরোনো জমিদারবাড়িতে আশ্রয় নেওয়া বিভিন্ন সময়ের ভূতেদের গল্প তুলে ধরেছেন পরিচালক অনীক দত্ত। বাড়িটি ভেঙে বহুতল নির্মাণ করতে চায় এক প্রোমোটার। নিজেদের বাসস্থান রক্ষা করতে একজোট হয় নানা যুগের ভূতেরা। ছবিটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো, এখানে ভূতেরা শুধু ভয় দেখায় না; তাদের রয়েছে নিজস্ব ব্যক্তিত্ব, দুঃখ, অভিমান ও হাস্যরস। সামাজিক ব্যঙ্গ, দুর্দান্ত সংলাপ এবং অভিনয়ের কারণে ছবিটি বাংলা সিনেমায় বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।

যেখানে ভূতের ভয়
ভূতের গল্প শুনতে যারা ভালোবাসেন, তাদের জন্য এই সিনেমাটি একেবারে উপযুক্ত। সত্যজিৎ রায়ের পুত্র সন্দীপ রায় ছবিটিতে একাধিক ভৌতিক গল্পকে একসূত্রে গেঁথেছেন। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ভূত ভবিষ্যৎ’এবং সত্যজিৎ রায়ের ‘ব্রাউন সাহেবের বাড়ি, ‘অনাথ বাবুর ভয়’ ও ‘লখনউয়ে ডুয়েল’ অবলম্বনে তৈরি হয়েছে ছবিটি। প্রতিটি গল্পের রয়েছে আলাদা রহস্য, আলাদা ভৌতিক আবহ। কোথাও হাসির উপাদান, কোথাও আবার অজানা আতঙ্ক। এক সিনেমায় কয়েক রকম ভূতের স্বাদ পেতে চাইলে এটি অবশ্যই দেখতে পারেন।
গয়নার বাক্স
ভূতের গল্পের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক, নারীজীবন ও হাস্যরসের মিশেল দেখতে চাইলে ‘গয়নার বাক্স’ হতে পারে দারুণ পছন্দ। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র এক মৃত বৃদ্ধা, যিনি ভূত হয়ে ফিরে আসেন তার পরিবারের এক তরুণী সদস্যের কাছে। তার প্রিয় গয়নার বাক্সটি ঘিরেই তৈরি হয় নানা ঘটনা। কখনো ভয়, কখনো হাসি, আবার কখনো আবেগ—সব মিলিয়ে ছবিটি বাংলা হরর-কমেডির জগতে আলাদা পরিচিতি পেয়েছে। মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় ছবিটির অন্যতম আকর্ষণ।
ছায়াময়
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখা উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘ছায়াময়’ মূলত রহস্য, অ্যাডভেঞ্চার ও ভূতের গল্পের মিশ্রণ। ছবিতে ইন্দ্রজিৎ নামের এক গবেষক গুপ্তধনের সন্ধানে পশ্চিমবঙ্গের এক গ্রামে আসে। সেখানে তার পরিচয় হয় ছায়াময় নামের এক অদ্ভুত ভূতের সঙ্গে। তবে এই ভূত মোটেও ভয়ংকর নয়। বরং সে মানুষের উপকার করে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। সব্যসাচী চক্রবর্তীর অভিনয়ে ছায়াময় চরিত্রটি হয়ে উঠেছে বেশ স্মরণীয়। পরিবারের সবাইকে নিয়ে উপভোগ করার মতো একটি সিনেমা এটি।
সব ভুতুড়ে
ভূত সত্যিই আছে, নাকি সবই মানুষের কল্পনা—এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে ‘সব ভুতুড়ে’ ছবির গল্প। একটি অতিপ্রাকৃত বিষয়ক পত্রিকার সম্পাদক অ্যানিকেত একটি রহস্যময় গ্রামে গিয়ে অদ্ভুত সব ঘটনার মুখোমুখি হয়। বিশেষ করে গ্রামের একটি স্কুলকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়ে ভৌতিক আতঙ্ক। আবির চট্টোপাধ্যায় ও সোহিনী সরকারের অভিনয় ছবিটির অন্যতম আকর্ষণ। যারা রহস্যের জট খুলতে খুলতে ভূতের অস্তিত্বের সন্ধান করতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য এই সিনেমাটি বেশ উপভোগ্য।

বল্লভপুরের রূপকথা
ভূত চতুর্দশীতে একটু অন্য ধরনের ভূতের গল্প দেখতে চাইলে বেছে নিতে পারেন ‘বল্লভপুরের রূপকথা’। বাদল সরকারের বিখ্যাত নাটক অবলম্বনে তৈরি এই সিনেমার গল্প একটি জরাজীর্ণ রাজবাড়িকে ঘিরে। রাজবাড়ির আর্থিক দুরবস্থার কারণে সেটি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয় রাজপরিবারের উত্তরসূরি ভূপতি। কিন্তু বাড়িতে বসবাসকারী রাঘু নামের এক ভূত সেই পরিকল্পনায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ভূত, রাজবাড়ি, সম্পত্তি বিক্রি এবং একের পর এক হাস্যকর ঘটনা—সব মিলিয়ে ছবিটি দুর্দান্ত বিনোদন দেয়। অনির্বাণ ভট্টাচার্যের পরিচালনা এবং শিল্পীদের অভিনয় ছবিটিকে বাংলা সিনেমার সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম উপভোগ্য ভূত-কমেডিতে পরিণত করেছে।
ছবি: সংগৃহীত



