৭ নভেম্বর, ২০২৬ | শনিবারবাংলা: ২২ কার্তিক ১৪৩৩
বিশ্ব

রূপকথার রাজকন্যাদের সঙ্গে বাস্তবের রাজকন্যাদের পার্থক্য কোথায়?

1_qICLMZR.jpg

রাজকন্যা বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রাজপ্রাসাদ, মুকুট, জমকালো পোশাক আর রাজকীয় জীবনযাপনের ছবি। রূপকথার গল্পে তাদের জীবন আবর্তিত হয় রাজপুত্র, বিয়ে কিংবা সিংহাসনকে ঘিরে। তবে একুশ শতকের বাস্তবতায় রাজকন্যাদের জীবন অনেকটাই আলাদা। রাজকীয় পরিচয়ের পাশাপাশি কেউ নিচ্ছেন ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার প্রস্তুতি, কেউ উচ্চশিক্ষায় গড়ছেন নিজের অবস্থান, আবার কেউ তৈরি করছেন স্বতন্ত্র পেশাগত পরিচয়।

স্পেনের রাজকন্যা লিওনর, বেলজিয়ামের রাজকন্যা এলিজাবেথ, নেদারল্যান্ডসের ক্রাউন প্রিন্সেস আমালিয়া এবং নরওয়ের রাজকন্যা ইনগ্রিড আলেকজান্দ্রা—তাদের জীবনেই দেখা যায় রাজকীয় দায়িত্বের পাশাপাশি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের গুরুত্ব। ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তারা সামরিক প্রশিক্ষণ, উচ্চশিক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন।

স্পেনের রাজকন্যা লিওনরকে ভবিষ্যৎ সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে। পাশাপাশি তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন। অন্যদিকে বেলজিয়ামের রাজকন্যা এলিজাবেথ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস ও রাজনীতিতে স্নাতক সম্পন্ন করে বর্তমানে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পাবলিক পলিসিতে স্নাতকোত্তর করছেন। নেদারল্যান্ডসের ক্রাউন প্রিন্সেস আমালিয়াও রাজনীতি, মনোবিজ্ঞান, আইন ও অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। নরওয়ের রাজকন্যা ইনগ্রিড আলেকজান্দ্রা সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ে সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা করছেন।

তবে সব রাজকন্যার জীবন সিংহাসনের উত্তরাধিকারকে কেন্দ্র করে আবর্তিত নয়। কেউ কেউ রাজকীয় পরিচয়ের বাইরেও নিজেদের দক্ষতা ও আগ্রহের জায়গা তৈরি করেছেন। থাইল্যান্ডের রাজকন্যা সিরিভান্নাভারি নারিরাতানা ফ্যাশন ডিজাইনে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ফ্যাশন অঙ্গনে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। থাই ঐতিহ্য, রেশম ও কারুশিল্পকে আধুনিক নকশায় তুলে ধরছেন তিনি। খেলাধুলাতেও রয়েছে তার সাফল্য। ২০১৭ সালের দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় গেমসে ড্রেসাজে রৌপ্যপদক অর্জন করেন এই রাজকন্যা।

জাপানের রাজকন্যা কাকোও রাজকীয় দায়িত্বের পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রয়েছেন। বিশেষ করে শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষের সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কার্যক্রমে তার অংশগ্রহণ আধুনিক রাজকন্যাদের বহুমুখী ভূমিকার পরিচয় দেয়।

অন্যদিকে জাপানের সাবেক রাজকন্যা মাকো কোমুরোর জীবন রাজকীয় পরিচয় ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মধ্যকার দ্বন্দ্বের একটি উদাহরণ। সাধারণ নাগরিক কেই কোমুরোকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় জাপানের রাজপরিবারের আইন অনুযায়ী তাকে রাজকীয় সদস্যপদ ছেড়ে দিতে হয়। নিজের পছন্দের জীবনকে গুরুত্ব দিয়ে রাজকীয় পরিচয় ত্যাগের এই সিদ্ধান্ত ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে।

Advertisements

তবে রাজকীয় মর্যাদার সঙ্গে রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতাও। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, বিদেশ সফর, কূটনৈতিক সংবর্ধনা ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমে নিয়মিত অংশ নিতে হয় তাদের। পাশাপাশি পোশাক, বক্তব্য, আচরণ ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও জনসাধারণের ব্যাপক আগ্রহ থাকে। ফলে সব সময় নিজেদের আচরণ ও ভাবমূর্তি নিয়ে সতর্ক থাকতে হয়। বিশেষ করে সিংহাসনের উত্তরাধিকারীদের ক্ষেত্রে এই চাপ আরও বেশি।

সব মিলিয়ে, একুশ শতকে রাজকন্যা হওয়ার অর্থ বদলে যাচ্ছে। রাজকীয় ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি শিক্ষা, পেশাগত দক্ষতা, সামাজিক সম্পৃক্ততা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা গুরুত্ব পাচ্ছে। কেউ ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কেউ নিজের পেশাগত পরিচয় গড়ছেন, আবার কেউ রাজকীয় পরিচয়ের বাইরে নতুন জীবন বেছে নিচ্ছেন।

রূপকথার রাজকন্যাদের গল্প যেখানে রাজপুত্র কিংবা সিংহাসন লাভে শেষ হয়, সেখানে বাস্তবের রাজকন্যাদের গল্প এগিয়ে চলছে শিক্ষা, দায়িত্ব, যোগ্যতা ও আত্মপরিচয় নির্মাণের মধ্য দিয়ে। তাই আধুনিক রাজকন্যাদের জীবন আর শুধু রাজপ্রাসাদের চাকচিক্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ে তৈরি হচ্ছে তাদের নিজস্ব পরিচয়।

Advertisements