কান্নার জন্য ভাড়া করা যায় সুদর্শন যুবক, মুছে দেন চোখের পানিও

মানসিক চাপ কমাতে কান্না করতে চান, কিন্তু পাশে কাউকে পাচ্ছেন না? জাপানে এমন একটি অভিনব সেবা চালুর খবর একসময় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল, যেখানে অর্থের বিনিময়ে সুদর্শন তরুণদের ডেকে এনে কান্নার পরিবেশ তৈরি করা হতো। শুধু আবেগঘন ভিডিও দেখানোই নয়, কান্নার পর রুমাল দিয়ে চোখের পানিও মুছে দিতেন তারা। টোকিওভিত্তিক এই সেবার নাম ইকেমেসো দানশি।
জাপানি ভাষায় ইকেমেসো দানশি বলতে মোটামুটি সুদর্শন কান্নার সঙ্গী বোঝায়। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম ছিল মূলত অফিসকেন্দ্রিক। কর্মীদের মানসিক চাপ কমাতে বিশেষ সেশনের আয়োজন করা হতো, যেখানে আবেগঘন ভিডিও দেখিয়ে তাদের অনুভূতি প্রকাশে উৎসাহিত করা হতো।
জাপানে মানসিক চাপ কমাতে সুদর্শন তরুণ ভাড়া করার এক অভিনব সেবা চালু রয়েছে। টোকিওভিত্তিক ইকেমেসো দানশি নামের একটি প্রতিষ্ঠান অফিসে গিয়ে কর্মীদের আবেগঘন ভিডিও দেখিয়ে কাঁদতে সাহায্য করে। এরপর রুমাল দিয়ে তাদের চোখের পানি মুছে দেন বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত তরুণেরা। কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ কমানো এবং আবেগ প্রকাশে উৎসাহ দেওয়াই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে জাপানি উদ্যোক্তা হিরোকি তেরাই এই সেবা চালু করেন। জাপানি ভাষায় ইকেমেসো দানশি বলতে সুদর্শন কান্নার সঙ্গী বোঝায়। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে গ্রাহকেরা অনলাইন ক্যাটালগ থেকে নিজেদের পছন্দের তরুণ নির্বাচন করতে পারেন। নির্ধারিত দিনে সেই তরুণ অফিসে গিয়ে কান্নার বিশেষ সেশন পরিচালনা করেন।
সেশনে অংশগ্রহণকারীদের আবেগঘন সিনেমার দৃশ্য দেখানো হয়। কখনো দুঃখের গল্প শোনানো কিংবা মন খারাপ করা সংগীত পরিবেশন করা হয়। এসবের মাধ্যমে কর্মীদের নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে উৎসাহ দেওয়া হয়। কেউ কেঁদে ফেললে তার চোখের পানি আলতোভাবে রুমাল দিয়ে মুছে দেন দায়িত্বপ্রাপ্ত তরুণ।
এই সেবার পেছনে রয়েছে হিরোকি তেরাইয়ের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। তিনি আগে জাপানে বিবাহবিচ্ছেদ উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। সেখানে বিচ্ছেদের সময় অনেক দম্পতিকে কাঁদতে দেখেছেন। কান্নার পর তাদের অনেকেই মানসিকভাবে স্বস্তি অনুভব করার কথা জানাতেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি কান্নাকে মানসিক চাপ কমানোর একটি উপায় হিসেবে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করেন।
জাপানের কর্মসংস্কৃতিতে প্রকাশ্যে আবেগ দেখানো অনেক সময় দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষ করে অফিসে কান্না করলে সহকর্মীদের কাছে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে। তেরাইয়ের মতে, এই সামাজিক মনোভাবের কারণে অনেকে নিজেদের অনুভূতি চেপে রাখেন। তার উদ্যোগের লক্ষ্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে মানুষ সংকোচ ছাড়াই আবেগ প্রকাশ করতে পারেন।
প্রতিষ্ঠানটির সেবার জন্য ২০১৫ সালে প্রতি সেশনে ৭ হাজার ৯০০ ইয়েন নেওয়া হতো। গ্রাহকদের জন্য বিভিন্ন ধরনের ব্যক্তিত্ব ও চেহারার তরুণদের তালিকাও রাখা হয়েছিল। কেউ চাইলে শান্ত স্বভাবের, কেউ বুদ্ধিদীপ্ত কিংবা অন্য ধরনের ব্যক্তিত্বের তরুণ বেছে নিতে পারতেন।
২০১৮ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের এক প্রতিবেদনে এই অভিনব উদ্যোগের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। সেখানে জানানো হয়, কান্নার মাধ্যমে মানসিক স্বস্তি দেওয়ার ধারণাটি জাপানে রুই-কাতসু নামে পরিচিত। এই চর্চায় মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে আবেগঘন পরিবেশে অংশ নিয়ে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করেন।
২০২৫ সালের আগস্টে অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেন টাইমসের এক প্রতিবেদনেও ইকেমেসো দানশির কার্যক্রম উঠে আসে। সেখানে প্রায় ২০ জন কান্নার সেশন পরিচালনাকারীর একটি দলের কথা উল্লেখ করা হয়। তবে ২০২৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত সেবাটির বর্তমান বুকিং ব্যবস্থা ও কার্যক্রমের পরিধি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
জাপানের এই উদ্যোগ দেখিয়েছে, মানসিক চাপ মোকাবিলায় প্রচলিত পদ্ধতির বাইরেও ভিন্ন ধরনের সেবা গড়ে উঠতে পারে। তবে এমন সেবা পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসার বিকল্প নয়।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক



