পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধির ৮০ শতাংশের বেশি এসেছে তিন মৌলিক পণ্য থেকে

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় বেড়েছে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে এ খাতে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৮ কোটি ডলারে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ৯৯৭ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় বেড়েছে প্রায় ৬০ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
তবে রপ্তানি আয়ের এই প্রবৃদ্ধিতে সব ধরনের পোশাকপণ্যের অবদান সমান নয়। বটমওয়্যার বা প্যান্টসহ বিভিন্ন ধরনের নিচের অংশের পোশাক, সোয়েটার ও কার্ডিগান এবং টি-শার্ট ও ভেস্ট—এই তিন শ্রেণির প্রচলিত পণ্যই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ জুড়ে রয়েছে। এসব পণ্য থেকে পাওয়া অতিরিক্ত আয় মোট পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধির প্রায় ৮০ শতাংশের সমান। বিপরীতে তুলনামূলক উন্নত ও বেশি মূল্য সংযোজনকারী পোশাকপণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ধীরগতিতে। কয়েকটি পণ্যের ক্ষেত্রে আবার আয় কমেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) সংকলিত পরিসংখ্যানে দেশের পোশাক রপ্তানির এই চিত্র উঠে এসেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে মৌলিক ধরনের পোশাকপণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ আয় করেছে ৮২৬ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ আয় বেড়েছে ৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অর্থের হিসাবে এ শ্রেণির পণ্য থেকে অতিরিক্ত আয় এসেছে ৫৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার। দেশের মোট পোশাক রপ্তানি আয়ের যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তার প্রায় ৯৪ শতাংশের সমান এই অতিরিক্ত আয়।
মোট পোশাক রপ্তানিতে মৌলিক পণ্যের অংশও আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে। গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে মোট রপ্তানিতে এসব পণ্যের অংশ ছিল ৭৭ দশমিক ০৮ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮ দশমিক ০৬ শতাংশে। অর্থাৎ রপ্তানি আয় বাড়লেও দেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধি এখনো মূলত পরিচিত ও প্রচলিত পণ্যের ওপর নির্ভরশীল।
পণ্যভিত্তিক হিসাবে, বটমওয়্যার রপ্তানি থেকে আয় বেড়েছে ২০ কোটি ১০ লাখ ডলার। সোয়েটার ও কার্ডিগান রপ্তানিতে অতিরিক্ত আয় এসেছে ১৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার। অন্যদিকে টি-শার্ট ও ভেস্ট রপ্তানি থেকে আয় বেড়েছে ১০ কোটি ৪০ লাখ ডলার। এই তিন শ্রেণির পণ্য মিলিয়ে অতিরিক্ত রপ্তানি আয় হয়েছে ৪৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার। ফলে সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে এ পণ্যগুলোর অবদান উল্লেখযোগ্য।
শিশুদের পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। প্রথম প্রান্তিকে এ শ্রেণির পণ্য রপ্তানি থেকে আয় বেড়েছে ১০ দশমিক ১৯ শতাংশ। তবে প্রবৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি হলেও মোট আয়ের পরিমাণ অন্যান্য বড় পণ্যশ্রেণির চেয়ে কম। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে শিশুদের পোশাক রপ্তানি করে আয় হয়েছে প্রায় ৩০ কোটি ডলার।
অন্যদিকে, মৌলিক পণ্যের বাইরে আধা-মৌলিক পোশাকের মধ্যে শার্ট ও ব্লাউজ রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে সামান্য। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এসব পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৮৪ কোটি ২০ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেশি।
শার্ট ও ব্লাউজ রপ্তানি থেকে আয় বাড়লেও মোট পোশাক রপ্তানিতে এ শ্রেণির পণ্যের অংশ কমেছে। গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে মোট রপ্তানিতে শার্ট ও ব্লাউজের অবদান ছিল ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৯৬ শতাংশে। অর্থাৎ এ খাতে রপ্তানি আয় বাড়লেও সামগ্রিক পোশাক রপ্তানির তুলনায় প্রবৃদ্ধির গতি কম থাকায় মোট রপ্তানিতে এর আপেক্ষিক অংশ হ্রাস পেয়েছে।
তুলনামূলক উন্নত এবং বেশি মূল্য সংযোজনকারী পোশাকপণ্যের রপ্তানি পরিস্থিতি আরও ধীর। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এ শ্রেণির পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১৪৮ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৪২ শতাংশ। অর্থের হিসাবে আয় বেড়েছে প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ডলার।
এই শ্রেণির পণ্যগুলোর মধ্যে আউটারওয়্যার রপ্তানি থেকে আয় বেড়েছে ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার। টেকনিক্যাল ওয়্যার বা বিশেষ কারিগরি বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন পোশাক রপ্তানিতেও অতিরিক্ত আয় এসেছে ১ কোটি ৮০ লাখ ডলার। তবে এসব পণ্যের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পোশাকশ্রেণিতে আয় কমে যাওয়ায় সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি সীমিত রয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ড্রেস রপ্তানি থেকে আয় কমেছে ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ। স্পোর্টসওয়্যার ও অ্যাকটিভওয়্যার রপ্তানিতে কমেছে ১১ দশমিক ২৪ শতাংশ। একই সময়ে স্যুট ও এনসেম্বলস রপ্তানি থেকে আয় কমেছে ১৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এসব পণ্যের আয় কমে যাওয়ায় উচ্চমূল্য সংযোজনকারী পোশাকের সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে চাপ তৈরি হয়েছে।
উন্নত পোশাকপণ্যের আয় বাড়ার গতি কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে মোট রপ্তানিতে এ শ্রেণির অংশের ওপরও। গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে মোট পোশাক রপ্তানিতে এসব পণ্যের অবদান ছিল ১৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৯৮ শতাংশে। অর্থাৎ সামগ্রিক পোশাক রপ্তানি বাড়লেও উন্নত পণ্যের অংশ আগের তুলনায় কমেছে।
প্রথম প্রান্তিকের এই পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানি আয় বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলেও প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এখনো কয়েকটি পরিচিত পণ্যের ওপর নির্ভর করছে। বটমওয়্যার, সোয়েটার, কার্ডিগান এবং টি-শার্টের মতো পণ্যে আয় বাড়লেও উন্নত ও বিশেষায়িত পোশাকের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে শুধু প্রচলিত পোশাকের উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানো নয়, পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তুলনামূলক বেশি মূল্য সংযোজনকারী পোশাকের বাজার সম্প্রসারণ, নতুন নকশা ও প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য তৈরি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো গেলে রপ্তানি আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
একই সঙ্গে উন্নত পোশাকপণ্যের ক্ষেত্রে যেসব শ্রেণিতে আয় কমেছে, সেগুলোর বাজার পরিস্থিতি ও প্রতিযোগিতার কারণ চিহ্নিত করাও জরুরি। কারণ, কয়েকটি মৌলিক পণ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি খাতের বৈচিত্র্য বাড়ানোর পথে সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে পোশাক রপ্তানি থেকে আয় বৃদ্ধির তথ্য ইতিবাচক হলেও পণ্যভিত্তিক প্রবৃদ্ধির পার্থক্য খাতটির সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেছে। প্রচলিত পণ্যের সাফল্য ধরে রাখার পাশাপাশি উচ্চমূল্য সংযোজনকারী ও বিশেষায়িত পোশাকের রপ্তানি বাড়াতে পারলে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হবে।



