ইতিহাস গড়ার দ্বারপ্রান্তে জাতিসংঘ: প্রথম নারী মহাসচিবের সম্ভাবনা

৮০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন নারী প্রধান পেতে যাচ্ছে জাতিসংঘ। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ শেষ হতে চলার প্রেক্ষাপটে তার উত্তরসূরি নির্বাচনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছেছে। নতুন মহাসচিব আগামী বছরের ১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
তবে কে হবেন জাতিসংঘের দশম মহাসচিব? এই লড়াই এখন কেবল কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।
নিরাপত্তা পরিষদের সাম্প্রতিক অনানুষ্ঠানিক ভোটে কোস্টারিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট রেবেকা গ্রিনস্প্যান সাময়িক দৌড়ে এগিয়ে থাকলেও, মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী নারী কূটনীতিক লানা নুসাইবেহ যুক্ত হওয়ায় নির্বাচনী সমীকরণে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাধারী পাঁচ স্থায়ী সদস্য (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন ও রাশিয়া) এবং ১০টি অস্থায়ী সদস্য দেশের মোট ১৫টি ভোটের ওপর নির্ভর করছে এই পদের ভাগ্য। বিজয়ী প্রার্থীকে অন্তত ৯টি ভোট পেতে হবে, যেখানে আবার কোনো স্থায়ী সদস্যের ‘ভেটো’ থাকা চলবে না।
তালিকায় রয়েছেন বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট কূটনৈতিক ব্যক্তিত্ব:
লানা নুসাইবেহ (সংযুক্ত আরব আমিরাত): সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই প্রভাবশালী মন্ত্রী ও জাতিসংঘের সাবেক দূত এই নির্বাচনের দৌড়ে এসে নতুন গতি এনেছেন। সফল কূটনীতির জন্য পরিচিত নুসাইবেহ নিরাপত্তা পরিষদে জাতিসংঘের প্রস্তাব ২৭২০ পাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন, যা গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ উন্মুক্ত করেছিল। তিনি নির্বাচিত হলে হবেন জাতিসংঘের প্রথম নারী, প্রথম ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত এবং দ্বিতীয় আরব মহাসচিব।
রেবেকা গ্রিনস্প্যান (কোস্টারিকা): জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থার (আঙ্কটাড) বর্তমান মহাসচিব ও কোস্টারিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট। বহুপক্ষীয় কূটনীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সংকট মোকাবিলায় তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
মিশেল ব্যাচেলেট (চিলি): চিলির এই সমাজতন্ত্রী নেত্রী অগাস্তো পিনোশে সরকারের শাসনামলে নৃশংস নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে ২০০৬ সালে তিনি চিলির প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময় তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। অত্যন্ত সংবেদনশীল এই পদে কাজ করার সময় তিনি কিছু দেশের—বিশেষ করে চীনের—বিরাগভাজন হন; কারণ তিনি বেইজিং কর্তৃক উইঘুর সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর কথিত নির্যাতনের বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন। ৭৪ বছর বয়সী ব্যাচেলেটকে মেক্সিকো ও ব্রাজিল সমর্থন জানালেও, চিলিতে কট্টর ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট হোসে আন্তোনিও কাস্ত ক্ষমতায় আসার পর দেশটি তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়। এছাড়া, গর্ভপাতের অধিকারের পক্ষে অবস্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রও তার সমালোচনা করেছে।
মারিয়া ফারনান্দা এসপিনোসা (ইকুয়েডর): জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাবেক সভাপতি এবং ইকুয়েডরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী।
রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি (আর্জেন্টিনা): আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) বর্তমান মহাপরিচালক। জটিল ও জরুরি সামরিক-পরমাণু সংকট ব্যবস্থাপনায় তার সুখ্যাতি রয়েছে।
ক্যারোলিন রদ্রিগেজ বার্কেট (গায়ানা): জাতিসংঘে গায়ানার স্থায়ী প্রতিনিধি এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
ইভোন এ-বাকি (ইকুয়েডর): যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সে নিযুক্ত সাবেক রাষ্ট্রদূত, যিনি নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোগত সংস্কারের পক্ষে সোচ্চার।
ওলারা ওটুনু (উগান্ডা): জাতিসংঘের সাবেক আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেল ও উগান্ডার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
ম্যাকি সাল (সেনেগাল): সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট, যিনি আফ্রিকা মহাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
ভূরাজনীতি ও ভৌগোলিক আবর্তন
জাতিসংঘের অঘোষিত ‘আঞ্চলিক আবর্তন নীতি’ অনুযায়ী, এবার লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার একটি জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। সেই সূত্রে গ্রিনস্প্যান, গ্রোসি কিংবা রদ্রিগেজ বার্কেটের সম্ভাবনা উজ্জ্বল বলে মনে করা হচ্ছিল।
তবে মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক সংকট উত্তরণে লানা নুসাইবেহের প্রার্থিতা এ সমীকরণকে অনেকটাই উন্মুক্ত করে দিয়েছে। ৪৮ বছর বয়সী নুসাইবেহ জানিয়েছেন, বিশ্ব সংস্থায় এখন একটি ‘প্রজন্মগত পরিবর্তন’ প্রয়োজন।
অন্যদিকে, ৭০ বছর বয়সী অর্থনীতিবিদ রেবেকা গ্রিনস্প্যান মনে করেন, বৈশ্বিক অবিশ্বাস এবং একের পর এক সশস্ত্র সংঘাতের এই যুগে জাতিসংঘের মূল সনদ ও সহযোগিতার মূলনীতি ফিরিয়ে আনা জরুরি।
যেসব চ্যালেঞ্জের মুখে নতুন মহাসচিব
যিনিই জাতিসংঘের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদের দায়িত্বে আসুন না কেন, তাকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে জটিল এবং সংকটময় এক সময়ের মুখোমুখি হতে হবে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন মহাসচিবের মূল পরীক্ষা হবে:
১. গাজা ও ইউক্রেন সংঘাত: ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা।
২. জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ সংস্কার: নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো পরিবর্তন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধীরগতি দূর করা।
৩. তহবিল সংকট: বিশ্বজুড়ে মানবিক সহায়তার চাহিদা বাড়লেও জাতিসংঘের তীব্র আর্থিক সংকট সামাল দেওয়া।
৪. জলবায়ু পরিবর্তন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই): দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি এবং জলবায়ু বিপর্যয়ের মতো নতুন বৈশ্বিক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক নীতিমালা তৈরি।
জাতিসংঘ সনদে মহাসচিব নির্বাচনের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া স্পষ্টভাবে বলা না থাকলেও দীর্ঘদিনের নিয়ম অনুযায়ী নিরাপত্তা পরিষদ মনোনীত প্রার্থীকে সাধারণ পরিষদ কর্তৃক চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই চূড়ান্ত নাম ঘোষণা করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।



