১৯ অক্টোবর, ২০২৬ | সোমবারবাংলা: ৩ কার্তিক ১৪৩৩
ধর্ম

কুমারী পূজা কী, কেন করা হয় এবং এর ইতিহাস

sh4L8COGD2aCPxV3wAM3PVquAKrNzDUJ3NBTY7Zj6_Vkh3LAys8-9OESVvI88buEsYyxkY0DHdx5Ml7dVc_H4hwVvZp4YfdJtfEy4aXz8C-GS6FuZR4lA2tfyZNbHhby0no-Bff6OM4Fv-NxiqmbQZjRja_JQrR3zUM55B5c4zp2Wt3l05zMdRoXGOCYV6tS

দুর্গাপূজার মহাঅষ্টমীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আচার হলো কুমারী পূজা। এ পূজায় একজন কুমারী বালিকাকে দেবী দুর্গা বা আদ্যাশক্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করে পূজা করা হয়। হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, নারীশক্তি, মাতৃত্ব, পবিত্রতা ও সৃষ্টির অন্তর্নিহিত শক্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর একটি বিশেষ মাধ্যম এই পূজা। বিশেষ করে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনে মহাঅষ্টমীর দিন কুমারী পূজা একটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহ্য হিসেবে পালিত হয়।

সংগৃহীত

কুমারী পূজার ইতিহাস ও উৎপত্তি

কুমারী পূজার শিকড় প্রাচীন হিন্দুধর্মের দেবী উপাসনা ও শাক্ত ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই প্রথার উৎপত্তি ঠিক কোন সময়ে হয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা কঠিন। তবে প্রাচীন বৈদিক সাহিত্য, মহাকাব্য ও পুরাণে দেবীকে কুমারী বা তরুণী নারীর রূপে কল্পনা করার বিভিন্ন উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে শাক্ত সাধনা ও দুর্গাপূজার নানা আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে কুমারী পূজা আরও সুসংহত রূপ লাভ করে।

ধর্মীয় ব্যাখ্যায়, নারীকে কেবল পার্থিব জীবনের একটি পরিচয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে তার মধ্যে দেবীশক্তির প্রকাশ উপলব্ধি করাই কুমারী পূজার মূল দর্শন। এ বিশ্বাসে একটি শিশুকন্যার মধ্যেও জগৎজননী বা মহাশক্তির প্রতীকী উপস্থিতি কল্পনা করা হয়। তাই কুমারীকে দেবীর আসনে বসিয়ে তার পূজা করা হয়।

সংগৃহীত

কুমারী পূজার আধুনিক ইতিহাসে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ছোট মেয়েদের মধ্যে দেবীমাতার প্রকাশ উপলব্ধি করতেন এবং তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেন। ১৯০১ সালে বেলুড় মঠে প্রথম দুর্গাপূজার সময় স্বামী বিবেকানন্দ একাধিক কুমারীর পূজা করেন। পরবর্তী সময়ে বেলুড় মঠে মহাঅষ্টমীতে কুমারী পূজা নিয়মিত ঐতিহ্যে পরিণত হয়। বর্তমানে সেখানে একজন কুমারীকে পূজা করার প্রচলন রয়েছে।

অন্যদিকে, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে কুমারী পূজার রীতি ও ব্যাখ্যায় কিছু পার্থক্য দেখা যায়। কামাখ্যা মন্দিরের ঐতিহ্যেও কুমারী পূজা গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে কুমারীকে দেবী কামাখ্যার প্রকাশ হিসেবে পূজা করা হয়। অর্থাৎ, স্থান ও সম্প্রদায়ভেদে আচার-অনুষ্ঠানের ধরন আলাদা হলেও নারীশক্তিকে দেবীরূপে সম্মান জানানোর ধারণাটি এই পূজার কেন্দ্রে রয়েছে।

কীভাবে করা হয় কুমারী পূজা?

Kumari Puja during Maha Ashtami at Belur Math.
সংগৃহীত

কুমারী পূজা সাধারণত দুর্গাপূজার মহাঅষ্টমী তিথিতে অনুষ্ঠিত হয়। তবে অঞ্চল, মন্দির ও ধর্মীয় সম্প্রদায় অনুযায়ী পূজার সময় ও আচার-অনুষ্ঠানে পার্থক্য থাকতে পারে। পূজার প্রধান ধাপগুলো হলো—

Advertisements

১. কুমারী নির্বাচন: ধর্মীয় বিধান ও প্রচলিত রীতি অনুসারে পূজার জন্য একজন কুমারী বালিকাকে নির্বাচন করা হয়। প্রচলিত শাস্ত্রীয় বর্ণনায় সাধারণত এক থেকে ১৬ বছর বয়সী কন্যার উল্লেখ রয়েছে। তবে সব মন্দিরে একই বয়স বা নির্বাচনের নিয়ম অনুসরণ করা হয় না।

২. স্নান ও সাজসজ্জা: পূজার দিন নির্বাচিত কন্যাকে স্নান করিয়ে পরিষ্কার ও নতুন পোশাক পরানো হয়। প্রচলিত রীতি অনুসারে তাকে ফুল, মালা, অলংকার, সিঁদুর ও আলতা দিয়ে সাজানো হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে লাল শাড়ি বা লাল রঙের পোশাক পরানো হয়।

সংগৃহীত

৩. দেবীর আসনে বসানো: সাজসজ্জা শেষে কুমারীকে একটি সুসজ্জিত আসনে বসানো হয়। ভক্তরা তাঁকে সাধারণ শিশু হিসেবে নয়, বরং দেবীশক্তির প্রতীক হিসেবে শ্রদ্ধা জানান। পূজার পুরো আয়োজনেই তাঁর প্রতি সম্মান ও মর্যাদা বজায় রাখা হয়।

৪. মন্ত্রপাঠ ও উপাচারে পূজা: পুরোহিত ধর্মীয় বিধি অনুসারে মন্ত্রপাঠ করে পূজা সম্পন্ন করেন। ফুল, চন্দন, ধূপ, প্রদীপ, নৈবেদ্যসহ বিভিন্ন উপাচার নিবেদন করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ষোড়শোপচারে অর্থাৎ ১৬ ধরনের উপাচারে পূজার প্রচলন রয়েছে। বেলুড় মঠের বর্ণনা অনুযায়ী, দেবী দুর্গার পূজায় যে ধরনের নিবেদন করা হয়, কুমারী পূজাতেও অনুরূপ উপাচার দেওয়া হয়।

৫. পুষ্পাঞ্জলি ও প্রণাম: পূজার সময় ভক্তরা ফুল নিবেদন করেন এবং কুমারীর পায়ে ফুল দিয়ে প্রণাম জানান। রামকৃষ্ণ মঠের ঐতিহ্যে প্রবীণ সন্ন্যাসীরাও কুমারীর চরণে ফুল নিবেদন করেন। এর মধ্য দিয়ে দেবীশক্তি ও নারীসত্তার প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করা হয়।

৬. আরতি ও প্রসাদ বিতরণ: পূজার শেষ পর্যায়ে আরতি করা হয়। এরপর প্রচলিত রীতি অনুসারে ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হতে পারে। মন্দিরভেদে পূজার অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতাও যুক্ত হয়।

বয়স অনুযায়ী কুমারীর বিভিন্ন নাম

সংগৃহীত

প্রচলিত শাস্ত্রীয় ধারায় কুমারীর বয়স অনুযায়ী দেবীর বিভিন্ন নাম কল্পনা করা হয়। বহুল প্রচলিত একটি তালিকা হলো—

বয়সকুমারীর নাম
১ বছরসন্ধ্যা
২ বছরসরস্বতী
৩ বছরত্রিধামূর্তি
৪ বছরকালিকা
৫ বছরসুভাগা
৬ বছরউমা
৭ বছরমালিনী
৮ বছরকুব্জিকা
৯ বছরকালসন্দর্ভা
১০ বছরঅপরাজিতা
১১ বছররুদ্রাণী
১২ বছরভৈরবী
১৩ বছরমহালক্ষ্মী
১৪ বছরপীঠনায়িকা
১৫ বছরক্ষেত্রজ্ঞা
১৬ বছরঅন্নদা

উৎস: কুমারী পূজা সম্পর্কে প্রথম আলোয় প্রকাশিত ধর্মবিষয়ক প্রতিবেদন। অঞ্চল ও শাস্ত্রীয় পরম্পরাভেদে নামের বানান বা তালিকায় পার্থক্য থাকতে পারে।

কুমারী পূজার মূল তাৎপর্য কী?

সংগৃহীত

কুমারী পূজার মূল দর্শন হলো নারীশক্তির মধ্যে দেবীশক্তির প্রকাশ উপলব্ধি করা। হিন্দুধর্মের শাক্ত পরম্পরায় দেবীকে সৃষ্টির শক্তি, মাতৃত্ব ও জগতের কল্যাণের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। সেই বিশ্বাস থেকেই একটি কুমারী বালিকাকে দেবীরূপে পূজা করা হয়।

এই পূজা নারীর প্রতি শ্রদ্ধা, মাতৃত্বের মর্যাদা এবং নারীসত্তার সম্মানকে সামনে নিয়ে আসে। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের শিক্ষা ও রামকৃষ্ণ মিশনের ঐতিহ্যেও কুমারীর মধ্যে দেবীমাতার প্রকাশ উপলব্ধি করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

সংগৃহীত

তবে কুমারী পূজার সব রীতি সর্বত্র এক নয়। কোথাও এটি দুর্গাপূজার একটি বিশেষ আয়োজন, কোথাও আবার বৃহত্তর শাক্ত উপাসনার অংশ। নেপালের জীবন্ত দেবী কুমারীর ঐতিহ্যের সঙ্গে ভারত ও বাংলাদেশের দুর্গাপূজায় অনুষ্ঠিত কুমারী পূজার পার্থক্যও রয়েছে। তাই সব কুমারী পূজাকে একই ধরনের প্রথা হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

Advertisements