১৬ অক্টোবর, ২০২৬ | শুক্রবারবাংলা: ৩১ আশ্বিন ১৪৩৩
জীবনযাপন

বিশ্ব খাদ্য দিবস:খাদ্য উৎপাদন বাড়লেই হবে না, নিশ্চিত করতে হবে পুষ্টিও

world-food_20251016_123301597

খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা একটি দেশের জনস্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। মানুষের সুস্থ জীবন নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি ও দারিদ্র্য হ্রাসেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিজমি হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে সবার জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতিতে কৃষি গবেষণা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের সমন্বিত প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্যও খাদ্যব্যবস্থার উন্নয়নে নতুন চিন্তা, কার্যকর প্রযুক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে আসে।

বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকে কৃষি উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। উন্নত বীজ, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ, কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং কৃষি গবেষণার ফলে সীমিত জমিতে খাদ্য উৎপাদন অনেক বেড়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কমে যাওয়ার মতো প্রতিকূলতা সত্ত্বেও দেশের কৃষি খাত খাদ্য চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। কৃষক, কৃষিবিজ্ঞানী, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এ অগ্রগতিকে সম্ভব করেছে। তবে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি খাদ্যের গুণগত মান, পুষ্টিমূল্য, নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করাই পুষ্টি নিরাপত্তার একমাত্র শর্ত নয়। একজন মানুষের সুস্থ থাকার জন্য প্রয়োজন সুষম ও বৈচিত্র্যময় খাদ্য। ভাত বা গমের মতো প্রধান খাদ্যশস্যের পাশাপাশি ডাল, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, শাকসবজি ও ফলমূলের পর্যাপ্ত প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে এসব খাদ্য মানুষের আর্থিক সামর্থ্যের মধ্যে থাকতে হবে। বাজারে পুষ্টিকর খাবার পাওয়া গেলেও উচ্চমূল্যের কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ তা নিয়মিত কিনতে না পারলে পুষ্টির ঘাটতি দূর করা সম্ভব নয়। তাই খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ন্যায্যমূল্য, পুষ্টিশিক্ষা, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।

বাংলাদেশের কৃষি বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, তাপপ্রবাহ এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ফসলের উৎপাদন ও গুণগত মানের ওপর প্রভাব ফেলছে। দেশের সব অঞ্চলের কৃষি পরিস্থিতিও এক রকম নয়। উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা, হাওর অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা, চরাঞ্চলে নদীভাঙন এবং উত্তরাঞ্চলের কিছু এলাকায় খরার ঝুঁকি কৃষকদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন সমস্যা তৈরি করছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অঞ্চলভিত্তিক কৃষি পরিকল্পনা গ্রহণ এবং স্থানীয় পরিবেশের উপযোগী ফসল উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

এ ক্ষেত্রে জলবায়ু সহনশীল, স্বল্প সময়ে পরিপক্ব, রোগবালাই প্রতিরোধী এবং অধিক পুষ্টিসমৃদ্ধ ফসলের জাত উদ্ভাবন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিকূল পরিবেশেও উৎপাদন ধরে রাখতে সক্ষম জাত কৃষকের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করবে। পাশাপাশি ফসলের বৈচিত্র্য বাড়ানো, মাটির উর্বরতা রক্ষা, পানির সঠিক ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, দীর্ঘমেয়াদে কৃষির পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখাও সমান জরুরি।

আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কৃষি খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। জেনেটিক্স, জিনোমিক্স, জিন এডিটিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং তথ্যনির্ভর কৃষিব্যবস্থার মাধ্যমে ফসলের উন্নত বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা, নতুন জাত উদ্ভাবনের সময় কমানো এবং রোগবালাইয়ের ঝুঁকি নিরূপণ করা সম্ভব হচ্ছে। প্রযুক্তির সহায়তায় মাটির অবস্থা, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, সেচের প্রয়োজন এবং সারের যথাযথ ব্যবহার সম্পর্কে আরও নির্ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। এর ফলে উৎপাদন খরচ কমানো, সম্পদের অপচয় রোধ এবং কৃষির দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়।

Advertisements

তবে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করার ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক যাচাই, পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং কৃষকের আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায় রাখা জরুরি। সব প্রযুক্তি সব অঞ্চলে সমানভাবে কার্যকর হবে না। তাই নতুন উদ্ভাবন মাঠপর্যায়ে পরীক্ষার মাধ্যমে এর কার্যকারিতা, ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মূল্যায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় ফসলের জাত, কৃষকদের অভিজ্ঞতা এবং প্রচলিত কৃষিজ্ঞানকে আধুনিক গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। এতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাস্তবসম্মত হবে এবং কৃষকও উদ্ভাবনের সুফল সহজে গ্রহণ করতে পারবেন।

অন্যদিকে, দ্রুত নগরায়ণ, শিল্পায়ন এবং অবকাঠামো নির্মাণের কারণে কৃষিজমি ক্রমাগত চাপের মুখে পড়ছে। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যের চাহিদা বাড়লেও জমির পরিমাণ বাড়ানোর সুযোগ সীমিত। তাই বিদ্যমান কৃষিজমির সর্বোত্তম ব্যবহার, উর্বর মাটি সংরক্ষণ, পানির অপচয় কমানো এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য। অপরিকল্পিতভাবে কৃষিজমির ব্যবহার পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পতিত জমিকে উৎপাদনের আওতায় আনার সম্ভাবনাও বিবেচনা করা যেতে পারে।

কৃষি খাতে প্রযুক্তির প্রসার ঘটাতে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ অর্থায়ন এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো দরকার। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা যেন নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে পিছিয়ে না পড়েন, সে বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়নও জরুরি। উৎপাদনের পর যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে বিপুল পরিমাণ খাদ্য নষ্ট হলে উৎপাদন বৃদ্ধির সুফল অনেকটাই কমে যায়। আধুনিক সংরক্ষণাগার, শীতল সরবরাহব্যবস্থা এবং উন্নত পরিবহন সুবিধা খাদ্যের অপচয় কমানোর পাশাপাশি কৃষকের ন্যায্য আয় নিশ্চিত করতে সহায়তা করতে পারে।

কৃষিকে তরুণ প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলাও ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ডিজিটাল বাজারব্যবস্থা সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। কৃষিকে শুধু প্রচলিত পেশা হিসেবে না দেখে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ব্যবসা ও উদ্ভাবননির্ভর একটি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এতে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়বে এবং কৃষির উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে।

কৃষি গবেষণার সাফল্য কেবল নতুন কোনো জাত বা প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উদ্ভাবনটি কৃষকের বাস্তব জীবনে কতটা পরিবর্তন আনতে পারছে, সেটিই এর কার্যকারিতা নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে উৎপাদন বাড়ছে কি না, চাষের খরচ কমছে কি না, কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে কি না এবং পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব হ্রাস পাচ্ছে কি না—এসব বিষয় নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। গবেষণার ফলাফল দ্রুত কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রম, প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের সংযোগ আরও জোরদার করতে হবে।

একই সঙ্গে কৃষি গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, আধুনিক পরীক্ষাগার, দক্ষ জনবল এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি। গবেষকদের জন্য উপযুক্ত কর্মপরিবেশ ও পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি উদ্যোক্তা এবং কৃষকদের মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে উঠলে নতুন উদ্ভাবন বাস্তবে প্রয়োগ করা সহজ হবে। গবেষণার ফলাফল যেন শুধু প্রতিবেদন বা পরীক্ষাগারে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং কৃষকের উৎপাদনব্যবস্থা ও সাধারণ মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।

বিশ্ব খাদ্য দিবসের তাৎপর্য হলো খাদ্য উৎপাদনের অগ্রগতিকে মানুষের জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও পুষ্টিকর খাদ্যের নিশ্চয়তায় রূপান্তর করা। এ লক্ষ্য অর্জনে বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষি, জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তি, কৃষকের ন্যায্য অধিকার এবং পুষ্টিকর খাদ্যের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি খাদ্য অপচয় কমানো, টেকসই উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সমাজের পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর পুষ্টির চাহিদা পূরণে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

আগামীর পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে বর্তমানের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবসম্মত সমাধান গ্রহণ করতে হবে। কৃষি গবেষণায় ধারাবাহিক বিনিয়োগ, প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। আজকের উদ্ভাবন যদি কৃষকের উৎপাদন বাড়ায়, খাদ্যের অপচয় কমায় এবং পুষ্টিকর খাবারকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসে, তাহলেই তার প্রকৃত সুফল পাওয়া সম্ভব। একটি টেকসই, নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে বর্তমানের গবেষণা, পরিকল্পনা ও কার্যকর পদক্ষেপই হতে পারে আগামী প্রজন্মের সুস্থ ও সমৃদ্ধ জীবনের ভিত্তি।

Advertisements