১৩ অক্টোবর, ২০২৬ | মঙ্গলবারবাংলা: ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩
ধর্ম

দ্বীনদার পাত্র না পেলে আজীবন অবিবাহিত থাকা যাবে? ইসলামের দৃষ্টিতে যা জানা জরুরি

55-6abee9a968c80

বিয়ে ইসলামে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ। তবে জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধু বিয়ের বয়স হয়েছে বলে কিংবা সামাজিক চাপের কারণে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে একজন নারী যখন উপযুক্ত দ্বীনদার পাত্র খুঁজে পান না, তখন তাঁর মনে প্রশ্ন আসতে পারে—সারাজীবন অবিবাহিত থাকলে কি শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো সমস্যা হবে?

ইসলামি নির্দেশনা অনুযায়ী, এ প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে ব্যক্তির পরিস্থিতি, বিয়ের প্রয়োজনীয়তা, গুনাহে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা এবং সম্ভাব্য জীবনসঙ্গীর ধর্মীয় ও নৈতিক অবস্থার ওপর। উপযুক্ত পাত্র না পাওয়া গেলে বিয়ে পিছিয়ে দেওয়া বা অবিবাহিত থাকার সিদ্ধান্ত সব ক্ষেত্রে শরিয়তবিরোধী নয়। তবে বিষয়টি বুঝতে বিয়ে সম্পর্কে ইসলামের মৌলিক নির্দেশনাগুলো জানা প্রয়োজন।

বিয়ের প্রতি ইসলামের উৎসাহ

পবিত্র কোরআনের সূরা আন-নূরের ৩২ নম্বর আয়াতে অবিবাহিত নারী-পুরুষের বিয়ের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আয়াতটিতে আরও বলা হয়েছে, তাঁরা অভাবগ্রস্ত হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাঁদের সচ্ছল করে দিতে পারেন। এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, বিয়েকে সহজ করা এবং উপযুক্ত নারী-পুরুষের বিবাহের ব্যবস্থা করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনার অন্তর্ভুক্ত। একই সঙ্গে আর্থিক অসচ্ছলতাকে বিয়ের ক্ষেত্রে একমাত্র বাধা হিসেবে না দেখার শিক্ষাও এতে রয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনেও বিয়ের গুরুত্ব স্পষ্ট। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইবাদতের পাশাপাশি বিশ্রাম নিতেন এবং বিবাহও করতেন। তিনি নিজের সুন্নাহ থেকে বিমুখ হওয়ার প্রবণতাকে নিরুৎসাহিত করেছেন।

এ ছাড়া সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে উসমান ইবনে মাজউন (রা.)-এর চিরকুমার থাকার প্রবণতাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) অনুমোদন করেননি বলে বর্ণিত হয়েছে। এসব হাদিস থেকে বোঝা যায়, ধর্মীয় জীবন পালনের নামে বিয়েকে সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করাকে ইসলামের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়।

Advertisements

পাত্র নির্বাচনে দ্বীনদারি ও চরিত্র কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ইসলামে জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুশীলন, নৈতিক চরিত্র ও দায়িত্বশীলতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জামে তিরমিজি ও সুনান ইবনে মাজাহতে বর্ণিত হাদিসে পাত্রের দ্বীন ও চরিত্রে সন্তুষ্ট হলে বিয়ের ব্যবস্থা করার নির্দেশনা পাওয়া যায়। অন্যথায় সমাজে ফিতনা ও ব্যাপক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। তবে দ্বীনদার হওয়ার অর্থ কেবল ধর্মীয় বিষয়ে গভীর জ্ঞান থাকা কিংবা আলেম হওয়া নয়। একজন পুরুষের বিশ্বাস, ফরজ ইবাদত পালনের আন্তরিকতা, সততা, উত্তম আচরণ, দায়িত্ববোধ এবং অন্যের অধিকার রক্ষার মানসিকতাও বিবেচনা করা জরুরি।

কোনো ব্যক্তি আলেম না হলেও তাঁর আকিদা সঠিক, চরিত্র ভালো এবং ইসলামের মৌলিক বিধান পালনে আন্তরিকতা থাকলে তাঁকে শুধু ধর্মীয় জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে বিয়ের অনুপযুক্ত মনে করা ঠিক নয়। স্বামী-স্ত্রী পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের ধর্মীয় জ্ঞান ও অনুশীলন আরও উন্নত করতে পারেন।

উপযুক্ত পাত্র না পেলে কী করবেন?

যদি কোনো নারী প্রত্যাশিত ধর্মীয় ও নৈতিক গুণাবলিসম্পন্ন পাত্র না পান, তাহলে শুধু সামাজিক চাপের কারণে বিয়ে করতে হবে—এমন কোনো সর্বজনীন বিধান নেই। বিয়ের সিদ্ধান্তে ব্যক্তির নিরাপত্তা, মানসিক শান্তি, মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ জীবনযাপনের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পাত্রের মধ্যে নির্যাতনমূলক আচরণ, গুরুতর নৈতিক সমস্যা, দায়িত্বহীনতা কিংবা ধর্মীয় বিধানের প্রতি স্পষ্ট অবজ্ঞা থাকলে বিয়ের আগে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কেবল বিয়ে করার জন্য নিজের নিরাপত্তা ও মৌলিক মূল্যবোধের সঙ্গে আপস করা সমীচীন নয়।

অন্যদিকে, একজন নারী যদি এমন পাত্রের অপেক্ষায় থাকেন যিনি ধর্মীয়ভাবে পরিপূর্ণ, সব বিষয়ে অভিজ্ঞ কিংবা তাঁর প্রত্যাশার প্রতিটি শর্ত পূরণ করেন, তাহলে বাস্তবসম্মতভাবে নিজের প্রত্যাশাগুলো পর্যালোচনা করাও উপকারী হতে পারে। দ্বীনদারি, উত্তম চরিত্র, পারস্পরিক সম্মান ও দায়িত্ববোধের মতো মৌলিক গুণাবলিকে অগ্রাধিকার দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

আজীবন অবিবাহিত থাকা কি শরিয়তসম্মত?

ইসলামে বিয়ের বিধান ব্যক্তিভেদে ও পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। কারও জন্য বিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বা ওয়াজিব হতে পারে, বিশেষত বিয়ে না করলে হারামে জড়িয়ে পড়ার প্রবল আশঙ্কা থাকলে এবং বিয়ের দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা থাকলে। অন্য পরিস্থিতিতে বিয়ে সুন্নত বা মুস্তাহাব হতে পারে। ব্যক্তির অবস্থা অনুযায়ী ফিকহি বিধান নির্ধারণে আলেমদের ব্যাখ্যা প্রয়োজন হতে পারে। তাই কেবল উপযুক্ত পাত্র না পাওয়ার কারণে বিয়ে পিছিয়ে দেওয়া কিংবা অবিবাহিত থাকার সিদ্ধান্তকে সব ক্ষেত্রে হারাম বলা যায় না। আবার বিয়ে না করার সিদ্ধান্তের পেছনে যদি বিয়ের সুন্নাহকে অবজ্ঞা করা কিংবা ধর্মীয়ভাবে বিয়েকে অপ্রয়োজনীয় মনে করার মতো বিষয় থাকে, তাহলে তার মূল্যায়ন আলাদা হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির বাস্তব পরিস্থিতি, মানসিক অবস্থা, শারীরিক ও আর্থিক সক্ষমতা এবং গুনাহে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বিবেচনা করা জরুরি। তাই আজীবন অবিবাহিত থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছ থেকে নিজের পরিস্থিতি অনুযায়ী পরামর্শ নেওয়া ভালো।

সিদ্ধান্তের আগে যে বিষয়গুলো বিবেচনা করা জরুরি
-পাত্রের ধর্মীয় বিশ্বাস, ইবাদত পালনের আন্তরিকতা ও নৈতিক চরিত্র।
-স্ত্রীর প্রতি সম্মান, দায়িত্বশীলতা এবং পারিবারিক দায়িত্ব পালনের মানসিকতা।
-পারস্পরিক বোঝাপড়া, মানসিক সামঞ্জস্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মিল।
-নির্যাতন, প্রতারণা বা গুরুতর অসদাচরণের কোনো ঝুঁকি রয়েছে কি না।
-বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত পরিস্থিতির কারণে, নাকি বিয়ে সম্পর্কে ভুল ধারণা বা সামাজিক অভিজ্ঞতার প্রভাবে নেওয়া হচ্ছে।

দ্বীনদার জীবনসঙ্গী চাওয়া একজন নারীর যৌক্তিক প্রত্যাশা। তবে দ্বীনদারির মূল্যায়ন শুধু ধর্মীয় জ্ঞানের গভীরতা দিয়ে নয়, বিশ্বাস, চরিত্র, আচরণ ও দায়িত্ববোধের মাধ্যমেও করা উচিত।

ইসলামে উপযুক্ত পাত্র না পাওয়া পর্যন্ত বিয়ে পিছিয়ে দেওয়া বা অবিবাহিত থাকার সিদ্ধান্ত সব পরিস্থিতিতে নিষিদ্ধ নয়। একইভাবে, বিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ হওয়ায় একে অবজ্ঞা করাও সমীচীন নয়। নিজের পরিস্থিতি বুঝে, শরিয়তের নির্দেশনা মেনে এবং প্রয়োজন হলে নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াই উত্তম।

এটি সাধারণ ইসলামি নির্দেশনার আলোকে লেখা। ব্যক্তিগত পরিস্থিতিতে বিয়ের নির্দিষ্ট শরয়ি বিধান নির্ধারণের জন্য যোগ্য আলেম বা মুফতির পরামর্শ নেওয়া উচিত।

Advertisements