৬ অক্টোবর, ২০২৬ | মঙ্গলবারবাংলা: ২১ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলাদেশ

একটি পরিবারের ভিত্তি যেমন তার সন্তানদের সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার ওপর নির্ভর করে, তেমনি দেশের ভবিষ্যৎও নির্ভর করে শিশুদের সঠিক বিকাশের ওপর: প্রধানমন্ত্রী

pm-3

একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ যেমন নির্ভর করে তার সন্তান কীভাবে বেড়ে উঠছে তার ওপর, তেমনি একটি দেশের আগামী দিনের চিত্রও অনেকাংশে নির্ভর করে আজকের শিশুর বিকাশের ওপর। প্রতিটি শিশুর ভেতরে লুকিয়ে থাকা প্রতিভা ও সম্ভাবনাকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে দিতে পারলে দেশের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) শিশু অধিকার দিবস ২০২৬ এবং বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

শিশুদের নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বড়দের বক্তব্যের চেয়ে শিশুদের কথা শোনাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। নিজের শৈশবের স্মৃতিও এদিন ফিরে আসে তার কথায়। শিশু একাডেমির কার্যক্রম শুরুর সময় তিনিও যে একজন শিশু হিসেবে সেখানে এসেছিলেন, সে কথা স্মরণ করেন তিনি।

পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তারেক রহমান জানান, শিশু একাডেমির ‘শিশু’ ম্যাগাজিনে তার ও ছোট ভাইয়ের লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত একটি বোর্ডে নিজের লেখা গল্প এবং ছোট ভাইয়ের লেখা দেখতে পেয়ে শৈশবের সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায় বলে জানান তিনি।

শিশুদের ভেতরে থাকা নানা ধরনের প্রতিভার প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেউ ছবি আঁকতে ভালোবাসে, কেউ কবিতা আবৃত্তি করে, আবার কেউ গান, নাচ কিংবা বাদ্যযন্ত্রের প্রতি আগ্রহী। প্রত্যেক শিশুর মধ্যেই কোনো না কোনো বিশেষ গুণ রয়েছে। প্রয়োজন শুধু সেই গুণটি আবিষ্কার করে তা বিকশিত করার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা।

নিজের গিটার ও কিবোর্ড শেখার আগ্রহের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। শিশুদের উদ্দেশে তার পরামর্শ, যারা গিটার, হারমোনিয়াম, বাঁশি কিংবা অন্য কোনো বাদ্যযন্ত্রে আগ্রহী, তারা যেন তা মন দিয়ে শেখে। গান, নাচ কিংবা কেরাত ও কোরআন তেলাওয়াতের মতো যেসব ক্ষেত্রে শিশুর আগ্রহ রয়েছে, সেখানেও দক্ষতা অর্জনের জন্য উৎসাহ দেন তিনি।

Advertisements

শুধু শিল্প-সংস্কৃতিই নয়, খেলাধুলাকেও শিশুদের সামগ্রিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রাথমিক পর্যায় থেকেই শিশুদের খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি জানান, প্রথমবারের মতো প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায় থেকে সারাদেশে ২২ লাখ শিশু—১১ লাখ ছেলে ও ১১ লাখ মেয়ে—ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে। এই ধরনের আয়োজন ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যেতে পারলে এখান থেকেই ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় উঠে আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

শিশুদের প্রতিভা খুঁজে বের করতে ‘নতুন কুঁড়ি’ কার্যক্রমের পাশাপাশি ক্রীড়া কার্যক্রমও নতুন করে চালু করার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। সিলেট থেকে শুরু করে ঢাকার আর্মি স্টেডিয়াম পর্যন্ত বিভিন্ন আয়োজনের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, একটি শিশুকে শুধু পড়াশোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে তার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ সম্ভব নয়। শিল্প, সংস্কৃতি, সংগীত কিংবা খেলাধুলার অন্তত একটি ক্ষেত্রে প্রতিটি শিশুর নিজের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।

তবে এই সুযোগ শুধু শহরের শিশুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না বলেও গুরুত্ব দেন তিনি। দেশের অনেক পরিবারের পক্ষে ব্যক্তিগতভাবে সন্তানদের গান, নাচ, বাদ্যযন্ত্র কিংবা খেলাধুলার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। তাই শহরের পাশাপাশি প্রত্যন্ত গ্রামের শিশুরাও যেন এসব সুযোগ পায়, স্কুল পর্যায় থেকেই সেই ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি শিশুর মধ্যেই কোনো না কোনো বিশেষ গুণ রয়েছে। তাকে সেই সুযোগ করে দিতে পারলেই সে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বিকশিত হতে পারবে। এ-সংক্রান্ত কার্যক্রম অনেকটাই গুছিয়ে আনা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ২০২৭ অথবা ২০২৮ সাল থেকে পুরো প্রক্রিয়া শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের আগ্রহ অনুযায়ী গান, বাদ্যযন্ত্র ও বিভিন্ন খেলাধুলার ক্ষেত্র বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে।

শিশুদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবন ও উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতির বিষয়টিও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। ভবিষ্যতে বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগের কথা বিবেচনায় রেখে স্কুল পর্যায় থেকেই অতিরিক্ত বিদেশি ভাষা শেখানোর পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি আরবি, ম্যান্ডারিন, জার্মান ও জাপানিজসহ কয়েকটি ভাষার মধ্য থেকে শিশুরা নিজেদের পছন্দের একটি ভাষা শেখার সুযোগ পাবে বলে জানান তিনি।

শিশুদের শুধু নিজেদের বিকাশ নয়, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের প্রতিও দায়িত্বশীল হয়ে ওঠার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। বাড়ি, স্কুল কিংবা আশপাশের গাছপালার যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি পশুপাখির প্রতিও সদয় হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

তার বক্তব্যে উঠে আসে একটি বৃহত্তর ভাবনা—শিশুর হাতে শুধু বই তুলে দিলেই ভবিষ্যৎ তৈরি হয় না; তার কল্পনা, সৃজনশীলতা, খেলাধুলা, সংস্কৃতিচর্চা এবং মানবিকতাকেও বেড়ে ওঠার জায়গা দিতে হয়। আর সেই সুযোগ যত বেশি বিস্তৃত হবে, আগামী দিনের বাংলাদেশও তত বেশি দক্ষ, সৃজনশীল ও মানবিক হয়ে উঠবে।

Advertisements