৬ অক্টোবর, ২০২৬ | মঙ্গলবারবাংলা: ২১ আশ্বিন ১৪৩৩
জীবনযাপন

নিজের অজান্তেই যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছেন না তো?সব করছেন, তবু আনন্দ নেই?

images (1)

সকাল হয়, ঘুম ভাঙে। তাড়াহুড়ো করে তৈরি হয়ে কর্মস্থলের পথে যাত্রা। দিনের বেশির ভাগ সময় কাজ, মাঝখানে খাবার, কিছু ফোনকল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটু স্ক্রল করা। এরপর সন্ধ্যা, রাতের খাবার, ঘুম। পরদিন আবার একই চক্র। এভাবে একদিন, দুইদিন নয়—কখন যে কয়েক সপ্তাহ কিংবা কয়েক মাস কেটে যায়, টেরই পাওয়া যায় না।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, এতগুলো দিন যেন ঠিকমতো বেঁচেই থাকা হয়নি। কী করেছি, কার সঙ্গে কথা বলেছি, কোথায় গিয়েছি—অনেক কিছুই স্পষ্ট মনে পড়ে না। জীবনটা যেন নিজের অজান্তেই একটি নির্দিষ্ট ছকে আটকে গেছে।

মনোবিজ্ঞানে এ ধরনের অবস্থাকে অনেক সময় ‘অটো পাইলট’ অবস্থার সঙ্গে তুলনা করা হয়। অর্থাৎ মানুষ দৈনন্দিন কাজগুলো করে যাচ্ছে, কিন্তু সেই কাজের প্রতি তার সচেতন উপস্থিতি বা মনোযোগ খুব কম। শরীর কাজ করছে, অথচ মন পড়ে আছে অন্য কোথাও। মানুষের মন স্বাভাবিকভাবেই অনেক সময় বর্তমান মুহূর্তের বাইরে চলে যায়। তবে এই প্রবণতা যখন দীর্ঘস্থায়ী হয়ে জীবনের আনন্দ, সম্পর্ক, মনোযোগ ও অর্থপূর্ণতার অনুভূতিকে প্রভাবিত করতে শুরু করে, তখন বিষয়টি নিয়ে ভাবার প্রয়োজন আছে।

কীভাবে বুঝবেন জীবন অটো পাইলটে চলছে?

এর প্রথম লক্ষণ হতে পারে দিনের ঘটনাগুলো মনে না থাকা। সকালে কী খেয়েছেন, কার সঙ্গে কথা বলেছেন কিংবা অফিস থেকে ফেরার পথে কী করেছেন—এসব ছোট ঘটনা মনে করতে গিয়ে হঠাৎ থমকে যেতে পারেন। গাড়ি চালানো, খাওয়া কিংবা ঘরের কাজের মতো পরিচিত কাজগুলোও তখন অনেকটা অভ্যাসের বশে সম্পন্ন হয়।

আরেকটি লক্ষণ হলো সময় খুব দ্রুত চলে যাচ্ছে বলে মনে হওয়া। সোমবার কখন শুক্রবার হয়ে গেল, মাস কখন শেষ হলো—বুঝে ওঠার আগেই সময় পেরিয়ে যায়। একদিনের সঙ্গে আরেক দিনের তেমন পার্থক্যও খুঁজে পাওয়া যায় না। এ সময় মনও খুব সহজে অন্যদিকে চলে যায়। কারও সঙ্গে কথা বলার সময় মাথায় ঘুরতে থাকে অন্য কোনো চিন্তা। বই পড়তে বসে কয়েক পৃষ্ঠা যাওয়ার পর বোঝা যায়, কী পড়েছেন তা মনে নেই। কোনো কাজ শুরু করেও বারবার ফোন হাতে নেওয়া কিংবা অন্য কাজে মন চলে যাওয়াও এর অংশ হতে পারে।

Advertisements

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহারও এই অভ্যাসকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। উদ্দেশ্য ছাড়াই স্ক্রল করতে করতে কখন যে আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা চলে গেছে, তা বোঝা যায় না। দিন শেষে ব্যস্ত থাকার অনুভূতি থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ এগোয় না। অটো পাইলট জীবনে সিদ্ধান্তহীনতাও দেখা দিতে পারে। নিজের ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও অন্যের অনুরোধে রাজি হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত কাজের চাপ নেওয়া কিংবা ‘না’ বলতে না পারার কারণে পরে মানসিক চাপ তৈরি হওয়া—এসবও সতর্ক হওয়ার মতো বিষয়।

এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে খিটখিটে মেজাজ, সামান্য ঘটনায় বিরক্তি, সব সময় ক্লান্ত লাগা কিংবা কোনো কিছুতেই তেমন আনন্দ না পাওয়া। নিজের আবেগগুলো থেকেও যেন একটা দূরত্ব তৈরি হয়। কাজ, দায়িত্ব ও ব্যস্ততা চলতে থাকে, কিন্তু ভেতরে জীবনের প্রতি আগ্রহ ধীরে ধীরে কমে যায়।

ফিরবেন কীভাবে সচেতন জীবনে?

অটো পাইলট থেকে বের হওয়ার জন্য জীবনে বড় কোনো পরিবর্তন একদিনে আনতে হবে—এমন নয়। বরং শুরুটা হতে পারে খুব ছোট কিছু অভ্যাস দিয়ে। প্রতিদিন সকালে কয়েক মিনিট নিজের জন্য রাখা যেতে পারে। দিনটি কীভাবে কাটাতে চান, কোন কাজগুলো গুরুত্বপূর্ণ এবং কোন বিষয়গুলোতে মনোযোগ দেবেন—সেটা ভেবে নেওয়া যেতে পারে। রাতে ঘুমানোর আগে কয়েক মিনিট দিনের দিকে ফিরে তাকানোও উপকারী। আজ কী ভালো হয়েছে, কোথায় অমনোযোগী ছিলেন কিংবা কোন মুহূর্তটি উপভোগ করেছেন—এসব ভাবলে নিজের জীবন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ে।

গভীর শ্বাস নেওয়া, ধ্যান কিংবা মনোযোগ ধরে রাখার ছোট ছোট অনুশীলনও বর্তমান মুহূর্তে ফিরতে সাহায্য করতে পারে। একই সঙ্গে একসঙ্গে অনেক কিছু করার চেষ্টা না করে একটি কাজ শেষ করে পরের কাজে যাওয়ার অভ্যাস করা ভালো।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সীমা তৈরি করা জরুরি। ঘুম থেকে ওঠার পরপরই ফোন হাতে নেওয়ার বদলে কিছুটা সময় নিজের জন্য রাখা যেতে পারে। সেই সময় বই পড়া, হাঁটা, পরিবারের সঙ্গে কথা বলা কিংবা নিঃশব্দে বসে থাকাও হতে পারে।

জীবনকে আবার প্রাণবন্ত করতে রুটিনের বাইরে নতুন অভিজ্ঞতাও প্রয়োজন। নতুন কোনো জায়গায় যাওয়া, নতুন কিছু শেখা, প্রিয় মানুষের সঙ্গে অর্থপূর্ণ সময় কাটানো কিংবা দীর্ঘদিন ধরে ইচ্ছা থাকা কোনো কাজ শুরু করা—এসব ছোট পরিবর্তন মনের একঘেয়েমি ভাঙতে পারে।

সবশেষে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, নিখুঁত জীবনের অপেক্ষায় থাকা বন্ধ করা। প্রতিদিন সবকিছু পরিকল্পনামতো হবে না। ছোট সাফল্য, ছোট আনন্দ কিংবা নিজের জন্য নেওয়া ছোট সিদ্ধান্তগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

কারণ জীবন শুধু একদিনের পর আরেকটি দিন পার করে দেওয়ার নাম নয়। ব্যস্ততার মাঝেও থামতে হয়, চারপাশ দেখতে হয়, অনুভব করতে হয়। কখনো কখনো নিজের কাছেই ফিরে আসতে হয়—যাতে জীবন শুধু চলছে না, সত্যিই বেঁচে থাকা হচ্ছে।

Advertisements