৬ অক্টোবর, ২০২৬ | মঙ্গলবারবাংলা: ২১ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলাদেশ

গতি বাড়াতে রেলের বহরে যুক্ত হচ্ছে ৩০ নতুন ইঞ্জিন

27

পুরোনো ইঞ্জিনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রেলপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বাড়াতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। মিটারগেজ রেলপথের মেয়াদোত্তীর্ণ ও পুরোনো লোকোমোটিভের জায়গায় এবার যুক্ত হতে যাচ্ছে ৩০টি নতুন ডিজেল-ইলেকট্রিক ইঞ্জিন। এসব ইঞ্জিন কেনায় ব্যয় হবে প্রায় ২ হাজার ৭০ কোটি টাকা। আর পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা।

নতুন লোকোমোটিভ কেনার এই প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য বুধবার (৭ অক্টোবর) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পের আওতায় সংগ্রহ করা হবে ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ। প্রতিটি ইঞ্জিনের আনুমানিক দাম পড়বে ৬৯ কোটি টাকা। তবে কোন দেশ বা নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এসব ইঞ্জিন কেনা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সরবরাহকারী নির্বাচন করা হবে।

প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ৮১১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। বাকি প্রায় ১ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দেবে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি)।

পুরোনো ইঞ্জিনেই চলছে রেল

বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে বর্তমানে ২৯২টি লোকোমোটিভ রয়েছে। এর মধ্যে ১৬৪টি মিটারগেজ এবং ১২৮টি ব্রডগেজ। রেলওয়ের মেকানিক্যাল কোড-ম্যানুয়েল অনুযায়ী একটি লোকোমোটিভের অর্থনৈতিক আয়ু ২০ বছর। অথচ মিটারগেজের ১১৫টি লোকোমোটিভ ইতোমধ্যে সেই আয়ু পেরিয়ে গেছে।
শুধু তাই নয়, ৬২টি মিটারগেজ লোকোমোটিভের বয়স ৪০ বছরেরও বেশি। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত এসব ইঞ্জিন দিয়েই এখনো ট্রেন পরিচালনা করতে হচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে কমছে ইঞ্জিনগুলোর নির্ভরযোগ্যতা।

পুরোনো লোকোমোটিভের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংগ্রহও দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। অনেক ক্ষেত্রে যন্ত্রাংশের সংকটের কারণে ইঞ্জিন দীর্ঘ সময় অচল পড়ে থাকে। এতে ট্রেন পরিচালনায় তৈরি হয় বাড়তি চাপ, প্রভাব পড়ে সময়ানুবর্তিতাতেও।

Advertisements

বাড়বে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা

রেলওয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন ৩০টি লোকোমোটিভ যুক্ত হলে মিটারগেজ রেলপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বাড়বে। বিশেষ করে আন্তঃনগর ট্রেন পরিচালনার পাশাপাশি বাড়তে থাকা পণ্য পরিবহনের চাহিদা পূরণে নতুন ইঞ্জিনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

একই সঙ্গে ট্রেন পরিচালনার দক্ষতা বাড়বে, কমবে পুরোনো ইঞ্জিনের ওপর নির্ভরতা। নতুন লোকোমোটিভ ব্যবহারের ফলে ট্রেনের চলাচলের সময় ও পরিচালন ব্যয় কমানোরও আশা করছে রেলওয়ে।

এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ করিডোরগুলোর একটি ঢাকা-চট্টগ্রাম-ঢাকা রেলপথ। দেশের অন্যতম ব্যস্ত এই মিটারগেজ পথে প্রতিদিনই যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাপ বাড়ছে। কিন্তু সেই তুলনায় ডিজেল লোকোমোটিভের সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়। ফলে নতুন ইঞ্জিন যুক্ত হলে এই করিডোরসহ মিটারগেজ নেটওয়ার্কে পরিবহন সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

মিটারগেজ থাকবে আরও কয়েক দশক

রেলওয়ের মাস্টার প্ল্যানে ২০৪০ সালের মধ্যে দেশের মিটারগেজ রেললাইনগুলোকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বিভিন্ন কারণে সেই কাজ পিছিয়ে যাওয়ায় বাস্তবে ২০৫৫ থেকে ২০৬০ সাল পর্যন্ত মিটারগেজ ট্রেন পরিচালনার প্রয়োজন হতে পারে।

এই দীর্ঘ সময়ের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই নতুন মিটারগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রেলওয়ের ভাষ্য, পুরোনো ইঞ্জিন দিয়ে এত দীর্ঘ সময় বাড়তি চাপ সামলানো কঠিন। তাই যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা সচল রাখতে নতুন লোকোমোটিভ প্রয়োজন।

শুধু ইঞ্জিন নয়, আসছে প্রশিক্ষণও

প্রকল্পে শুধু ৩০টি ইঞ্জিন কেনার বিষয়টিই রাখা হয়নি। নতুন লোকোমোটিভ পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ক্যাপিটাল ও কনজুমেবল স্পেয়ার্স, টুলস এবং বিভিন্ন যন্ত্রপাতিও সংগ্রহ করা হবে।

পাশাপাশি বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রকৌশলী ও সুপারভাইজারদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও থাকবে। প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের কারিগরি বিশেষজ্ঞরা স্থানীয় কর্মীদের নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেবেন। নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ারের মাধ্যমে কারিগরি সহায়তাও দেওয়া হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের উপপ্রধান (রেল পরিবহন) মো. নাজমুল হাসান বলেন, ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহের প্রকল্পটি একনেক সভায় উপস্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ট্রেনের পরিবহন সময় ও ব্যয় কমার পাশাপাশি পরিবহন সক্ষমতা বাড়বে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) মো. সুবক্তগীনও মনে করেন, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনসেবা বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

Advertisements