সাক্ষী হয়েও আদালতে অনুপস্থিত, ৭০০ পুলিশের বিরুদ্ধে পরোয়ানা

চট্টগ্রামে বিভিন্ন মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হিসেবে তালিকাভুক্ত প্রায় ৭০০ পুলিশ সদস্য আদালতে নির্ধারিত সময়ে হাজির না হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এদের মধ্যে কেউ চট্টগ্রাম নগর পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত, আবার অনেকে বদলি হয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিটে দায়িত্ব পালন করছেন।
আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্র এবং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) একাধিক দাপ্তরিক চিঠি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানা গেছে। সাক্ষীদের আদালতে হাজিরা নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটে ‘অতীব জরুরি’ চিঠি পাঠিয়েছে সিএমপি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এসব পুলিশ সদস্য কোনো না কোনো মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে আদালতে হাজির না হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে প্রথমে সমন, পরে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছে। এরপরও অনেকের আদালতে উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়নি।
সিএমপির উপকমিশনার (সদর) দপ্তর থেকে গত ৩ অক্টোবর দেশের বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটে ১৮টি পৃথক স্মারকে পাঠানো চিঠিতে সংশ্লিষ্ট সদস্যদের নির্ধারিত তারিখে সকাল ৯টায় আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, সাক্ষীদের অনুপস্থিতি মামলাগুলোর বিচার নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ‘প্রধান অন্তরায়’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সাক্ষীদের মধ্যে কনস্টেবল থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদমর্যাদার পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য রয়েছেন। তাদের কেউ বর্তমানে চট্টগ্রামে কর্মরত, আবার কেউ ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কক্সবাজার, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, সিলেট, চাঁদপুর, সুনামগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা ও ইউনিটে দায়িত্ব পালন করছেন। অনেকে কর্মরত আছেন অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), নৌ পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ ও বিশেষ শাখার (এসবি) মতো বিশেষায়িত ইউনিটেও। সিএমপির তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে যেসব পুলিশ সদস্যের সাক্ষ্য দেওয়ার কথা রয়েছে, তাদের বড় একটি অংশ একসময় চট্টগ্রাম নগর পুলিশের বিভিন্ন থানায় কর্মরত ছিলেন। তাদের দায়িত্ব পালনের সময়ের বিভিন্ন ঘটনা ও মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকায় তারা পরবর্তী সময়ে এসব মামলার রাষ্ট্রীয় সাক্ষী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।
মামলাগুলো চট্টগ্রামের পতেঙ্গা, কোতোয়ালি, খুলশী, সদরঘাট, হালিশহর, চকবাজার, কর্ণফুলী, ডবলমুরিং, বায়েজিদ, চান্দগাঁও, আকবরশাহ, বাকলিয়া, পাঁচলাইশ, পাহাড়তলী ও ইপিজেড থানায় দায়ের করা।
এসব মামলার বিচার চলছে মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিভিন্ন বেঞ্চ, অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালত, জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন বিশেষ আদালত ও শিশু আদালতসহ বিভিন্ন আদালতে। শুধু সাধারণ মামলাই নয়, গুরুতর অপরাধের মামলার বিচারপ্রক্রিয়াতেও পুলিশ সাক্ষীদের অনুপস্থিতির প্রভাব পড়ছে। এরই মধ্যে গত ১৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ তৃতীয় আদালত ২০২২ সালে দায়ের হওয়া একটি হত্যা মামলায় পুলিশ কমিশনারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সিএমপির চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, নির্ধারিত তারিখে সাক্ষীরা আদালতে হাজির না হলে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৮৫(ক) ধারায় তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ফলে দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন থাকা এসব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিতে এখন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে পুলিশ সদস্যদের আদালতে সাক্ষ্য দিতে হাজির করা। বদলি, নতুন কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন কিংবা বিভিন্ন ইউনিটে সংযুক্তির কারণে পুরোনো মামলার সাক্ষীদের আদালতে হাজির করানো কতটা কঠিন হয়ে উঠেছে, প্রায় ৭০০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে জারি হওয়া পরোয়ানার ঘটনা সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে।



